বলিউডে এমন অনেক তারকার গল্প আছে, যাঁরা খ্যাতির শিখরে উঠেও হঠাৎ হারিয়ে যান। আবার কেউ কেউ আলোঝলমলে গ্ল্যামার দুনিয়া ছেড়ে স্বেচ্ছায় বেছে নেন একেবারে ভিন্ন কোনো জীবন। অভিনেত্রী পেরিজাদ জোরাবিয়ানের গল্প ঠিক তেমনই এক বিরল উদাহরণ। যে অভিনেত্রী একসময় অমিতাভ বচ্চন, ওম পুরি, শাবানা আজমি কিংবা ভিক্টর ব্যানার্জির মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন, তিনিই আজ করপোরেট দুনিয়ায় পরিচিত একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। চলচ্চিত্রের ক্যামেরা, ঝকঝকে প্রিমিয়ার আর রেড কার্পেট থেকে চিরতরে দূরে সরে গিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার এক বিশাল পোলট্রি ব্যবসা। রূপালি পর্দায় তাঁর ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ না হলেও তা ছিল বেশ স্মরণীয়, আর অভিনয় ছাড়ার পর তাঁর দ্বিতীয় জীবনের গল্পও কোনো সিনেমার চেয়ে কম নাটকীয় নয়।
মুম্বাইয়ের এক ইরানি পরিবারে জন্ম নেওয়া পেরিজাদের ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বড় ব্যবসায়ী হওয়ার। অনেক শিশু যখন অভিনেতা বা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন পেরিজাদ নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কল্পনা করতেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং নিউইয়র্ক থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। সেখানে পড়াশোনার সময়ই অভিনয়ের প্রতি এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হওয়ায় তিনি বিখ্যাত লি স্ট্রাসবার্গ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে এক বছরের অভিনয় প্রশিক্ষণ নেন। তবে দেশে ফিরে বাবার প্রতিষ্ঠিত ‘জোরাবিয়ানস চিকেনস’-এ কাজ শুরু করায় তাঁর মনে হয়েছিল জীবনটা হয়তো ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে একজন মডেল সমন্বয়কারীর নজরে পড়ায় জনপ্রিয় ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্র্যান্ডের একটি বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ পান তিনি, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর কিছুদিন পরই পরিচালক নাগেশ কুকুনুরের ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘বলিউড কলিং’-এ ওম পুরির বিপরীতে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে।
২০০০-এর দশকের শুরুতে যখন ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথাগত ধারার বাইরে ‘মনসুন ওয়েডিং’ বা ‘হায়দরাবাদ ব্লুজ’-এর মতো সমান্তরাল সিনেমাগুলো শহুরে দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল, পেরিজাদ তখন সেই বিশেষ ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি ‘মর্নিং রাগা’, ‘জগার্স পার্ক’ এবং ‘মুম্বাই ম্যাটিনি’র মতো প্রশংসিত ছবিতে কাজ করেন। এছাড়া ‘এক অজনবি’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সহশিল্পী হওয়া এবং ২০০৪ সালে একটি চীনা ছবিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে অভিনয় করা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক। তবে ৩৩ বছর বয়সে বিয়ে করার পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। স্বামী বোমান ইরানির (যিনি অভিনেতা বোমান নন) ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং নিজের মাতৃত্ব ও সংসারকে সময় দেওয়ার তাগিদ থেকে তিনি ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এরপর সুভাষ ঘাইয়ের ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ কিংবা নিখিল আদভানির ‘সালাম-এ-ইশক’-এর মতো বড় বড় সিনেমার প্রস্তাব এলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে তিনি সব ফিরিয়ে দেন।
অভিনয় ছাড়ার পর পেরিজাদ পুরোপুরি মনোযোগ দেন তাঁদের পারিবারিক ব্যবসায়, যা তখন নানা আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। নিজের ব্যবসায়িক শিক্ষা ও নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। আজ ‘জোরাবিয়ানস’ শুধু একটি পোলট্রি কোম্পানি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে যার বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১২০ কোটি রুপি এবং যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৭০০ কর্মী। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে গুণগত মানসম্পন্ন বিশেষায়িত পণ্য দিয়ে বাজারে তাঁরা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। সন্তানদের বড় করা এবং ব্যবসা সামলানোর এই কঠিন ভারসাম্যের মাঝে পেরিজাদ দেখিয়েছেন যে, সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনেই সীমাবদ্ধ নয়; আলোঝলমলে মঞ্চ ছেড়ে নিজের মতো করে জীবন সাজানোর মধ্যেও রয়েছে এক অসামান্য গৌরব।