অভিনয় ও নাচে প্রশিক্ষিত অঞ্জলি আনন্দের পরিবারও অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত। তবু বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে অভিনেত্রীকে। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অভিনয় ছেড়ে ভারত ছাড়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। হাতে থাকা সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকুও শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে করণ জোহরের ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ ছবিতে রণবীর সিংয়ের বোনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে।

সম্প্রতি ফারাহ খানের ইউটিউব অনুষ্ঠানে নিজের সেই কঠিন সময়ের কথা জানিয়েছেন অঞ্জলি। তিনি জানান, ২০২০ সালের লকডাউন ও কাজের সংকটের সময় প্রায় ছয় মাসের মধ্যেই তাঁর সঞ্চয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। অভিনয়ের কাজ না থাকায় তখন অন্য দেশে চলে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে গোয়ায় থাকার সময় কাস্টিং পরিচালক শানু শর্মার কাছ থেকে বার্তা পান। এরপর করণ জোহরের ছবির জন্য অডিশন দেন এবং তাঁর অভিনয় পছন্দ করেন পরিচালক।

অঞ্জলির ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই শরীরের গড়ন নিয়ে নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে। তাঁর দাবি, শানু শর্মার সঙ্গে দেখা হলেই প্রায়ই ওজন কমানোর পরামর্শ পেতেন তিনি। বলা হতো, ওজন কমালে তাঁকে কোনো কাজের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। বছরের পর বছর এমন কথা শোনার পরও শেষ পর্যন্ত সেই শানুর কাছ থেকেই আসে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল।

অভিনেত্রীর মতে, প্লাস সাইজ অভিনেতাদের নিয়ে বলিউডে এখনও নির্দিষ্ট কিছু ধারণা কাজ করে। অনেক সময় তাদের চরিত্রকে কমেডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় অথবা শরীরের গড়নকেই চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য করে তোলা হয়। অঞ্জলির প্রশ্ন, একজন অভিনেত্রী শুধু মোটা হওয়ার কারণে কি তাঁর অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে বিচার পাওয়ার সুযোগ হারাবেন?

টেলিভিশনের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেছিলেন অঞ্জলি। ২০১৭ সালে ‘উনট্যাগড’ ও ‘ঢাই কিলো প্রেম’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পান তিনি। পরে ‘কুলফি কুমার বাজেওয়ালা’তেও কাজ করেন। বিশেষ করে ‘ঢাই কিলো প্রেম’ তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। প্লাস সাইজ দুই মানুষের প্রেমের গল্পে অভিনয় করে প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি নিজের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছিল বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

বড় পর্দায় অঞ্জলির প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ‘বেল বটম’। তবে সেখানে তাঁর চরিত্রের পরিসর খুবই ছোট ছিল বলে হতাশ হয়েছিলেন তিনি। অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিতে তাঁকে এমন একটি দৃশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে তাঁর শরীরের ওপর পড়ে একজন সন্ত্রাসী ধরা পড়ে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্লাস সাইজ অভিনেতাদের চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।

তবে ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় মোড় এনে দেয়। ছবিতে রণবীর সিংয়ের বোন গায়ত্রী রনধাওয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন অঞ্জলি। করণ জোহরের ধর্মা প্রোডাকশনের ছবিতে সুযোগ পাওয়া তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ধর্মা প্রোডাকশনের ছবিতে কাজ করার ইচ্ছার কথা পরিচিতদের বলতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়।

‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ তাঁকে পরিচিতি এনে দিলেও এরপরও শরীরের গড়ন নিয়ে তৈরি প্রচলিত ধারণার মুখোমুখি হতে হয়েছে অঞ্জলিকে। তাঁর মতে, ছবিতে শরীর নিয়ে আত্মসম্মানের বার্তা দেওয়া একটি চরিত্রে অভিনয়ের পরও তাঁকে নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের মধ্যে আটকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘ডাব্বা কার্টেল’ ও ‘রাত জওয়ান হ্যায়’-এর মতো কাজের মাধ্যমে সেই গণ্ডি ভাঙার চেষ্টা করেছেন তিনি।

সম্প্রতি ‘ধামাল ৪’-এ অভিনয়ের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরীর নিয়ে কটাক্ষের মুখে পড়েছেন অঞ্জলি। এসব মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, কোনো চরিত্রে অভিনয় করা মানেই সেই চরিত্রের বক্তব্যকে সমর্থন করা নয়। তাঁর মতে, একজন অভিনেতাকে তাঁর শরীরের মাপ দিয়ে বিচার না করে তিনি কী করতে পারেন, সেটি দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।

অঞ্জলির ক্যারিয়ারের গল্প তাই দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের জায়গা তৈরির। একসময় যে অভিনেত্রী কাজের অভাবে সঞ্চয় হারিয়ে অভিনয় ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তিনিই এখন বড় বাজেটের হিন্দি ছবির অংশ। ‘ধামাল ৪’-এ অজয় দেবগন, রীতেশ দেশমুখ, আরশাদ ওয়ারসি ও জাভেদ জাফরির মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।