কয়েক প্রজন্মের রক সংগীতপ্রেমী ও ‘আর্টসেলিয়াক’দের কাছে আর্টসেল মানেই জর্জ লিংকন ডি কস্তা। ‘দুঃখবিলাস’, ‘অনুভূতি’, ‘পথচলা’ কিংবা ‘অনিকেত প্রান্তর’-এর অবিনশ্বর কণ্ঠ হয়ে গত ২৭ বছর ধরে কালজয়ী এই প্রগ্রেসিভ রক ব্যান্ডটির প্রধান মুখ ও কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। সেই লিংকনই এবার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন ব্যান্ডের নিয়মিত অন-স্টেজ কার্যক্রম থেকে। তবে তাঁর এই অনুপস্থিতিতে আর্টসেলের লাইভ কনসার্ট ও মঞ্চযাত্রা সচল রাখতে ‘ট্যুরিং ভোকাল’ হিসেবে যুক্ত হয়েছেন দেশের আরেক গুণী সংগীতশিল্পী বখতিয়ার হোসাইন।

গতকাল বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যান্ডের অফিশিয়াল পেজ থেকে প্রকাশিত এক যৌথ ভিডিও বার্তায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান ব্যান্ডের সদস্যরা। বর্তমানে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে কানাডায় অবস্থান করছেন লিংকন। দীর্ঘ ২৭ বছরের দীর্ঘ সংগীতজীবনে এই প্রথমবারের মতো তিনি আর্টসেলের কোনো নিয়মিত কার্যক্রম বা কনসার্ট থেকে দূরে আছেন।

ভিডিও বার্তায় সুদূর কানাডা থেকে যুক্ত হয়ে লিংকন বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম ব্যান্ডের সবাইকে এবং ফ্যানদের ছেড়ে দেশের বাইরে এত দিন থাকা। গত ২৭ বছরে আমি কখনো আর্টসেলের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকিনি। কিন্তু জীবনের চলার পথে মানুষের এমন কিছু পরিস্থিতি ও জটিলতা আসে, যা এড়ানো যায় না। এটা মূলত সময়েরই দাবি।’

লিংকন স্পষ্ট করে জানান, ব্যক্তিগত কারণেই তাঁকে আরও কিছুদিন দেশের বাইরে অবস্থান করতে হবে। তবে ভক্তদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এটি কোনোভাবেই ব্যান্ড থেকে বিদায় নয়, বরং একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। লিংকনের ভাষায়, ‘আমি ছোট একটা ব্রেক নিচ্ছি। তবে খুব দ্রুতই আমি আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসব।’

ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর নিজের অনুপস্থিতিতে নতুন ট্যুরিং ভোকাল নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তিনি নিজেই দিয়েছেন বলে জানান। লিংকনের মতে, কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং ব্যান্ডের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই সবার চেয়ে বড়। তাঁর অনুপস্থিতিতে যেন আর্টসেলের পথচলা স্থবির হয়ে না পড়ে এবং ভক্তরা যেন কনসার্টের উন্মাদনা থেকে বঞ্চিত না হন, সে কারণেই এই বিকল্প পথ বেছে নেওয়া।

লিংকনের অবর্তমানে এখন থেকে মঞ্চে আর্টসেলের গান পরিবেশন করবেন বখতিয়ার হোসাইন। নতুন এই কণ্ঠকে স্বাগত জানিয়ে লিংকন বলেন, ‘বখতিয়ার অসাধারণ একজন ভোকাল ও ডেডিকেটেড মিউজিশিয়ান। সে আর্টসেলের মূল আবেগ, ফিল এবং লিগ্যাসিটা খুব ভালো বোঝে।’

তবে ভক্তদের প্রতি একটি বিশেষ ও সংবেদনশীল অনুরোধও জানিয়েছেন বন্ডের এই প্রধান ভোকাল। তিনি বলেন, ‘দয়া করে কেউ কাউকে কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। বখতিয়ার যখন স্টেজে আর্টসেলের গান গাইবে, তখন তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও গুণের জন্য তাকে মন উজাড় করে ভালোবাসবেন। আমি শরীরীভাবে দূরে থাকলেও মানসিকভাবে সব সময় আর্টসেলের সঙ্গেই আছি।’

ভিডিও বার্তায় আর্টসেলের জাদুকরী গিটারিস্ট কাজী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা কখনোই লিংকনকে ছাড়া আর্টসেলের কিছু চিন্তা করিনি, ও-ই আমাদের মূল শক্তি। ওর জন্য গত ছয়-সাথ মাস ধরে আমরা কোনো স্টেজ শো করছি না। কিন্তু ফ্যানদেরও তো আমাদের গান শোনার একটা তাগিদ ও প্রয়োজন আছে। জীবনের প্রয়োজনে অনেক সময় কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।’

ব্যান্ডের আরেক জ্যেষ্ঠ গিটারিস্ট ও অন্যতম চালিকাশক্তি ইকবাল আসিফ জুয়েল জানান, লিংকন নিজেই চেয়েছিলেন, ব্যান্ড যেন তাঁর অনুপস্থিতিতে বসে না থাকে। জুয়েলের ভাষায়, ‘আমাদের এমন একজনকে প্রয়োজন ছিল, যে শুধু গায়কী দিয়ে গান গাইবে না; বরং আর্টসেলের ২৭ বছরের দীর্ঘ আবেগ, মেটাল ফিল ও দর্শনটাও নিজের ভেতর ধারণ করতে পারবে। সেই সব দিক বিবেচনা করেই বখতিয়ারকে আমাদের ট্যুরিং মেম্বার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।’

আর্টসেলের মতো ঐতিহাসিক ব্যান্ডের মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার নতুন দায়িত্ব পেয়ে বেশ আবেগাপ্লুত বখতিয়ার হোসাইন। তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আর্টসেল কোনো সাধারণ ব্যান্ড নয়, এটি একটি জীবন্ত লিগ্যাসি। লিংকন ভাইয়ের বিশাল জায়গা নেওয়ার মতো ধৃষ্টতা বা যোগ্যতা আমার নেই। তবে আমার ব্যক্তিগত সংগীতজীবনে আর্টসেল সব সময়ই আবেগের একটা বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন ভক্তদের সেই আবেগটা ধরে রাখতে পারি।’

উল্লেখ্য, বখতিয়ার হোসাইন একসময় চট্টগ্রামের জনপ্রিয় অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড ‘বে অব বেঙ্গল’ (Bay of Bengal)-এর লিড ভোকালিস্ট, গিটারিস্ট ও প্রধান গীতিকার ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি ব্যান্ডটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন।

১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা আর্টসেল বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড ও মূল ধারার রক ও মেটাল সংগীতের অন্যতম প্রধান প্রভাবশালী এবং পথপ্রদর্শক ব্যান্ড। ‘দুঃখবিলাস’, ‘অনুভূতি’, ‘ওলোটপালোট’, ‘অনিকেত প্রান্তর’সহ অসংখ্য কালজয়ী গান দিয়ে শ্রোতাদের কাছে এক অনন্য আবেগের নাম এই ব্যান্ডটি। তাই লিংকনের সাময়িক বিরতির খবর ভক্তদের জন্য কিছুটা বিষণ্নতার হলেও, বখতিয়ারের চেনা কণ্ঠে আর্টসেলকে নতুন অধ্যায়ে দেখার অপেক্ষায় আছেন দেশের হাজারো রকপ্রেমী।