পালিয়ে বিয়ে, স্বামীর হাতে অমানুষিক নির্যাতন, গর্ভাবস্থায় আত্মহত্যার চেষ্টা, নিরাশার এতসব বালুচরে আটকে পড়ার পরও দমে যাননি তিনি। কেবল কণ্ঠের জাদুতে জীবনতরিকে ভিড়িয়েছেন সাফল্যের তীরে। আট দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ২০টি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়ে ভারতীয় সংগীতকে সমৃদ্ধ করা সেই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী আশা ভোসলে আর নেই। গত ১২ এপ্রিল (রবিবার) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি ভক্ত।
লতার ছায়া থেকে ধ্রুবতারা হয়ে ওঠা
১৯৪২ সালে বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যুর পর ৯ বছর বয়সী আশা ও তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকর পরিবারের হাল ধরতে গান শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর বোম্বেতে নিজের জায়গা করতে লড়তে হয়েছে তাঁকে। লতা যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, সুরকাররা তখন ধ্রুপদী গানের জন্য লতাকেই বেছে নিতেন। আশা গাইতেন সেই সব গান, যা অন্য গায়িকারা ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু ও পি নায়ার এবং পরে আর ডি বর্মনের ছোঁয়ায় সেই সব ‘ক্যাবারে’ বা ‘পাশ্চাত্য ঘরানার’ গানেই নিজের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি।
আড়ালের জীবন ছিল যন্ত্রণার
মাইক্রোফোনের সামনে আশা ভোসলে মানেই চপলতা আর প্রাণশক্তি। কিন্তু তাঁর আড়ালের জীবন ছিল গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। ১৬ বছর বয়সে গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করার পর অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন তিনি। স্বামী মদ্যপ ছিলেন এবং গর্ভাবস্থায়ও আশাকে মারধর করতেন। নিজের আত্মজীবনীতে আশা জানিয়েছেন, চরম মানসিক যন্ত্রণায় তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
সন্তানদের হারিয়েছেন, লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু বারবার ফিরে এসেছেন গানের মঞ্চে। ২০১২ সালে মেয়ে বর্ষার আত্মহত্যা এবং ২০১৫ সালে ছেলে হেমন্তের ক্যানসারে মৃত্যুও তাঁকে গান থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
আর ডি বর্মন ও সাফল্যের শিখর
ও পি নায়ার পরিচিতি দিলেও আশাকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেন আর ডি বর্মন (পঞ্চম)। ১৯৬০-এর মাঝামাঝি থেকে এই জুটি ‘পিয়া তু আব তো আজা’ বা ‘দম মারো দম’-এর মতো গান দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। ১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ জয়ী এই শিল্পীর চিরবিদায় কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং ভারতীয় সংগীতের একটি স্বর্ণালী যুগের অবসান।