ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ‘দ্য অডিসি’ মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই বক্স অফিসে দুর্দান্ত সাফল্যের ইঙ্গিত দিয়েছে। উত্তর আমেরিকায় ছবিটি ১২০.৫ মিলিয়ন ডলার আয়ের পথে রয়েছে, যা ২০২৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্রের মধ্যে সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয়। একই সঙ্গে এটি ম্যাট ডেমনের অভিনয়জীবনের সর্বকালের সেরা ওপেনিং হিসেবেও রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে।

মুক্তির দিন শুক্রবার এবং প্রিভিউ প্রদর্শনী মিলিয়ে ছবিটির আয় দাঁড়িয়েছে ৫১.২ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু বৃহস্পতিবার রাতের প্রিভিউ থেকেই এসেছে ১৭.৬ মিলিয়ন ডলার, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ প্রিভিউ আয়ের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শক্তিশালী এই সূচনা ছবিটির প্রতি দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহেরই প্রমাণ।

উত্তর আমেরিকার বাইরেও ‘দ্য অডিসি’ সমানভাবে সাফল্য পাচ্ছে। ৭৩টি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ছবিটির উদ্বোধনী আয় ১৩৭.৩ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী উদ্বোধনী সপ্তাহান্তে ছবিটির মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫৭.৮ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

২০২৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক উদ্বোধনী আয়ের দিক থেকে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ। তালিকায় এর ওপরে রয়েছে ‘সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’ এবং ‘টয় স্টোরি ৫’। একই সঙ্গে এটি ক্রিস্টোফার নোলানের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক উদ্বোধনী আয়ের রেকর্ডও গড়েছে। এর আগে তাঁর ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’ ও ‘ওপেনহাইমার’ এই তালিকার শীর্ষে ছিল।

উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসেও ‘দ্য অডিসি’ নোলানের অন্যতম বড় সাফল্য। উদ্বোধনী আয়ের হিসাবে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং। শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছবিটি নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ব্রাজিলসহ ৪৫টি বাজারে এটি নোলানের সর্বকালের সেরা উদ্বোধনী আয়ের রেকর্ড গড়েছে। পাশাপাশি ১১টি দেশে ইউনিভার্সাল পিকচার্সের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয়।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছবিটির সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় তিন ঘণ্টার এই চলচ্চিত্রটি সিনেমাস্কোরে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে। রটেন টমেটোজে দর্শক স্কোর ৯৬ শতাংশ, যা নোলানের ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে স্ক্রিন ইঞ্জিন ও পোস্টট্র্যাকের জরিপে ৮১ শতাংশ দর্শক জানিয়েছেন, তাঁরা ছবিটি অন্যদের দেখার পরামর্শ দেবেন।

জরিপ অনুযায়ী, ৫১ শতাংশ দর্শক শুধুমাত্র ক্রিস্টোফার নোলানের নামের কারণেই সিনেমাটি দেখতে গেছেন। তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী দলকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৪৪ শতাংশ দর্শক, আর ম্যাট ডেমনের জন্য সিনেমাটি দেখেছেন ২৭ শতাংশ দর্শক।

ছবিটির আয়ের বড় একটি অংশ এসেছে আইম্যাক্স ও অন্যান্য প্রিমিয়াম লার্জ-ফরম্যাট প্রেক্ষাগৃহ থেকে। মোট আয়ের ৫২ শতাংশই এসেছে এসব প্রদর্শনী থেকে। হলিউডের বিখ্যাত টিসিএল চায়নিজ থিয়েটার একাই ২ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ ডলার আয় করেছে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ একক প্রেক্ষাগৃহ আয়ের রেকর্ড। দেশটির বিভিন্ন শহরে আইম্যাক্স ও ৭০ মিমি প্রদর্শনীর টিকিট উদ্বোধনী সপ্তাহান্তেই কার্যত বিক্রি শেষ হয়ে গেছে।

দর্শক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিনেমাটি দেখতে আসা দর্শকদের ৫৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৪১ শতাংশ নারী। বয়সভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় দর্শকগোষ্ঠী ছিল ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা। বিশ্লেষকদের মতে, ‘ওপেনহাইমার’-এর অস্কারজয়ী সাফল্যের পর নোলানের পরবর্তী চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকদের যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ‘দ্য অডিসি’র উদ্বোধনী আয় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন।

হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য অডিসি’র গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রয় যুদ্ধজয়ী বীর অডিসিয়ুস। যুদ্ধ শেষে নিজ রাজ্য ইথাকায় ফিরতে তাঁর সময় লাগে পুরো এক দশক। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় সমুদ্রদেবতা পোসেইডনের অভিশাপ, সাইক্লোপস পলিফেমাস, জাদুকরী সির্সি, সাইরেনদের প্রলোভন, পাতালপুরীর বিপদ এবং ক্যালিপসোর দ্বীপের মতো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ।

চলচ্চিত্রটিতে অডিসিয়ুসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। পেনেলোপ চরিত্রে অ্যান হ্যাথাওয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি দেখিয়েছেন। টম হল্যান্ড অভিনয় করেছেন টেলেমেকাস চরিত্রে, আর রবার্ট প্যাটিনসনকে দেখা গেছে অ্যান্টিনাসের ভূমিকায়। এছাড়া সামান্থা মর্টন, জেনডায়া, লুপিতা নিয়োঙ্গো, জন লেগুইজামো এবং হিমেশ প্যাটেলসহ তারকাবহুল অভিনয়শিল্পীরা নিজেদের চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয় উপহার দিয়েছেন।

বক্স অফিসের এই দুর্দান্ত সূচনার পর এখন চলচ্চিত্রপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের নজর আগামী সপ্তাহগুলোর দিকে। অনেকের ধারণা, ‘দ্য অডিসি’ শুধু নোলানের ক্যারিয়ারেই নয়, সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সফল হলিউড চলচ্চিত্র হিসেবেও নিজের অবস্থান আরও শক্ত করবে।