আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন মিলি ববি ব্রাউন-এর। মাত্র কিশোর বয়সে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া এই তারকা এখন অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক ও উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শিশুশিল্পী থেকে বৈশ্বিক আইকন হয়ে ওঠার যাত্রাটা সহজ ছিল না, কিন্তু দৃঢ়তা আর পরিকল্পিত পদক্ষেপ তাঁকে আজকের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
শৈশব: স্পেন থেকে আমেরিকা
২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি স্পেনের মারবেলায় জন্ম মিলির। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোটবেলাতেই ইংল্যান্ডে, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণে পরিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে স্থায়ী হলে শুরু হয় সংগ্রাম। অডিশনে একের পর এক প্রত্যাখ্যান, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিল যে একসময় দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছিল।
প্রথম দিকে টেলিভিশনে ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। Once Upon a Time in Wonderland, NCIS এবং Modern Family-এর মতো সিরিজে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি তাঁকে ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কিন্তু বড় সুযোগ তখনও আসেনি।
‘ইলেভেন’: এক চরিত্রেই বিশ্বজয়
২০১৬ সালে নেটফ্লিক্সের Stranger Things-এ ‘ইলেভেন’ চরিত্রে অভিনয় তাঁর জীবন বদলে দেয়। অল্প কথার, রহস্যময়, টেলিকাইনেটিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক কিশোরী চোখের ভাষা আর শরীরী অভিনয়ে চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলেন মিলি। সিরিজটি দ্রুত বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা পায় এবং পপ-সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
এই চরিত্রের জন্য তিনি একাধিক পুরস্কার ও মনোনয়ন পান। সবচেয়ে আলোচিত ছিল প্রাইমটাইম এমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন। অল্প বয়সে এমন স্বীকৃতি তাঁকে আলাদা মর্যাদা দেয়। ‘ইলেভেন’ শুধু একটি চরিত্র নয়, বরং মিলির পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
বড় পর্দায় বিস্তার
টেলিভিশনের সাফল্য তাঁকে নিয়ে যায় ব্লকবাস্টারের জগতে। মনস্টার ইউনিভার্সের ছবি Godzilla: King of the Monsters এবং পরবর্তী কিস্তিতে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন, বিশাল বাজেটের ছবিতেও তিনি স্বচ্ছন্দ।
অন্যদিকে Enola Holmes এ শার্লক হোমসের বোন এনোলা চরিত্রে অভিনয় করে ভিন্ন স্বাদ দেন। প্রাণবন্ত, বুদ্ধিদীপ্ত কিশোরী গোয়েন্দা হিসেবে তাঁর উপস্থিতি দর্শক-সমালোচক উভয়ের প্রশংসা পায়। এই ছবিতে তিনি নির্বাহী প্রযোজক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। পরবর্তী কিস্তি Enola Holmes 2 এও একই ভূমিকায় ফিরে আসেন, আর প্রযোজক হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
খ্যাতির চাপ ও ব্যক্তিগত লড়াই
বিশ্বখ্যাতির সঙ্গে আসে তীব্র সমালোচনা ও অনলাইন ট্রোলিং। অল্প বয়সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষাক্ত আক্রমণের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। একসময় টুইটার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বাধ্য হন। নানা সাক্ষাৎকারে মিলি বলেছেন, খ্যাতির চাপ সামলাতে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কতটা জরুরি।
তিনি বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তরুণদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। গ্ল্যামার জগতের তীব্র আলোছায়ার ভেতর দিয়ে দ্রুত পরিণত হয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিডিয়ার কৌতূহল, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সবই তাঁকে সামলাতে হয়েছে জনসমক্ষে থেকেই।
উদ্যোক্তা মিলি
অভিনয়ের বাইরে মিলি নিজের বিউটি ও স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড Florence by Mills প্রতিষ্ঠা করেন। তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে তৈরি এই ব্র্যান্ড দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এতে তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতার পরিচয় মেলে। অল্প বয়সেই আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠা এবং নিজের ব্র্যান্ড দাঁড় করানো তাঁকে হলিউডের নতুন প্রজন্মের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। টেলিভিশন সিরিজের পারিশ্রমিক, চলচ্চিত্র, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট এবং নিজস্ব ব্যবসা সব মিলিয়ে তিনি তরুণ বয়সেই শক্ত আর্থিক অবস্থান গড়ে তুলেছেন।
ইমেজ, প্রভাব ও বিতর্ক
সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় হওয়া এক প্রজন্মের প্রতিনিধি মিলি। তাঁর ফ্যাশন সেন্স, রেড কার্পেট উপস্থিতি, হেয়ারস্টাইল সবই দ্রুত ট্রেন্ড হয়ে যায়। তবে অল্প বয়সে অতিরিক্ত গ্ল্যামারাইজেশন নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। মিলির বক্তব্য পরিষ্কার, তিনি নিজের শর্তে বড় হতে চান। তিনি মনে করেন, একজন অভিনেত্রী হওয়ার আগে তিনি একজন মানুষ, এবং তাঁর বেড়ে ওঠার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
সামনে নতুন অধ্যায়
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ শেষ হওয়ার পর তাঁর সামনে এখন নতুন অধ্যায়। নতুন চলচ্চিত্র প্রকল্প, প্রযোজনা সংস্থা বিস্তার, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সব মিলিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান গড়তে প্রস্তুত। শিশু তারকা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হয়ে টিকে থাকা সহজ নয়, কিন্তু মিলির সচেতন ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তাঁকে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে রেখেছে।
২২ বছরেই যে পরিপক্বতা, বৈশ্বিক প্রভাব আর বহুমুখী সাফল্য তিনি অর্জন করেছেন, তা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। জন্মদিনে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয় এই যাত্রা কেবল শুরু।