মঞ্চে প্রবেশ করছেন আমির খান। হাতে বালিশ, বুকে হাত, আর মুখে সেই পরিচিত বিনয়ী হাসি। মুহূর্তের জন্য দর্শক বিভ্রান্ত হন, ইনি কি সত্যিই আমির? ভুল ভাঙে কিছুক্ষণ পর, যখন বোঝা যায় এটি আসলে কৌতুক অভিনেতা সুনীল গ্রোভারের নতুন এক অবতার। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-তে সুনীলের এই ‘উনিশ-বিশ আমির’ কিংবা ‘সালমান’ চরিত্রগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর এই নিখুঁত অভিনয় দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি মানুষের অভিনয় নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কোনো অলৌকিক সৃষ্টি?

ভাইরাল হওয়া প্রসঙ্গে নিজের চিরচেনা রসিকতায় সুনীল জানান, ভাইরাল হওয়ার কোনো বিশেষ কৌশল তাঁর জানা নেই। তাঁর মতে, বছরে দুবার যে ভাইরাল জ্বর হয়, তার জন্য কেবল অ্যান্টিবায়োটিকই দাওয়াই! তবে এই হাসাহাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতা। সুনীল তাঁর এই প্রক্রিয়াকে ‘ধ্যান’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি কেবল কাউকে নকল করেন না, বরং কিছু সময়ের জন্য সেই মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জগতকে দেখার চেষ্টা করেন। এই গভীর পর্যবেক্ষণই তাঁকে সাধারণ মিমিক্রি শিল্পীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।

হরিয়ানার মান্ডি ডাবওয়ালিতে জন্ম নেওয়া সুনীলের অভিনয়ের হাতেখড়ি শৈশবেই। শিক্ষক ও আত্মীয়দের নকল করে সবাইকে হাসানো সেই ছেলেই পরবর্তীকালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করেন। মঞ্চে ‘হ্যামলেট’-এর মতো গুরুগম্ভীর চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি কিংবদন্তি জসপাল ভাট্টির কাছে শিখেছেন সংলাপের সূক্ষ্ম প্রয়োগ। বড় পর্দায় ‘পাটাখা’, ‘ভারত’ কিংবা ‘জওয়ান’-এর মতো সিনেমায় নিজের জাত চেনালেও টেলিভিশনই তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিতি দিয়েছে। ‘গুথি’, ‘ড. মশহুর গুলাটি’ কিংবা ‘রিঙ্কু দেবী’ প্রতিটি চরিত্রই দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

দীর্ঘ সাত বছর পর কপিল শর্মার সঙ্গে পুনর্মিলন সুনীলের ক্যারিয়ারে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে ‘কুশপা রাজ’ থেকে শুরু করে ‘ডায়মন্ড রাজা’ প্রতিটি পর্বে নতুন রূপে হাজির হয়ে তিনি দর্শকদের চমকে দিচ্ছেন। তাঁর সহশিল্পী কিকু শারদা ও বিচারক অর্চনা পুরান সিংয়ের মতে, সুনীল কেবল মজার কথা বলেন না, তিনি চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরিচালক অদ্বৈত চন্দনের ভাষায়, অন্যরা যেখানে ক্যারিকেচার করেন, সুনীল সেখানে মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করেন।

এত অভিজ্ঞতার পরও সুনীল গ্রোভার এখনো মঞ্চের অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করেন। অমিতাভ বচ্চনকে নকল করতে গিয়ে একবার সংলাপ ভুলে যাওয়ার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। লাইভ শো সম্পর্কে তাঁর দর্শন হলো, দর্শককে হাসানো পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটি। কারণ, দর্শকের মেজাজ কখন কেমন থাকবে তা আগে থেকে বলা অসম্ভব। তবুও নিজের অনন্য শৈলী আর ‘শিল্পীর পাগলামি’ দিয়ে সুনীল প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল একজন অনুকরণকারী নন, বরং একজন খাঁটি অভিনেতা।