ছোট পর্দার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাতারা একদিকে তারকাশিল্পীদের লাখ লাখ টাকা পারিশ্রমিক দিচ্ছেন, অন্যদিকে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করা অনেক শিল্পী ন্যায্য সম্মানী থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি অভিনেতা রিফাত চৌধুরী নিজের পারিশ্রমিক না পাওয়া ও কম দেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক নিয়ে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের বলে জানিয়েছে অভিনয়শিল্পী সংঘ।

দুই যুগের বেশি সময় ধরে অভিনয় করছেন রিফাত চৌধুরী। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময়ই তাঁকে মূলত পার্শ্বচরিত্রে দেখা গেছে। সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিচালক ও প্রযোজকেরা তাঁকে নির্ধারিত পারিশ্রমিকের চেয়ে কম টাকা দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ করেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে জানান তিনি।

এর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিফাত বলেছিলেন, শুটিং শেষে সহকারী পরিচালক বা কখনো পরিচালক খামে করে পারিশ্রমিক দিতেন। পরে খাম খুলে দেখতেন, সেখানে নির্ধারিত অর্থের চেয়ে কম টাকা রয়েছে। কারণ হিসেবে কখনো বাজেট কম থাকার কথা বলা হতো, আবার কখনো ভুল করে কম টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হতো। তাঁর দাবি, বিষয়টি ইচ্ছাকৃত বলেই তিনি মনে করতেন। এ কারণে একপর্যায়ে কম অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রিফাতের এই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান পরিচালক জাহিদ প্রীতম। তিনি লেখেন, অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক নিয়ে সমস্যা এই ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিনের। তাঁর প্রশ্ন, বিভিন্ন সংগঠন ও গিল্ড তৈরি হওয়ার পরও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেন হচ্ছে না।

পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও নাট্য প্রযোজকদের সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক কম দেওয়া কিংবা বকেয়া রাখার অভিযোগে সংগঠনগুলো নিয়মিতই অভিযোগ ও সালিসের মুখোমুখি হয়।

পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীদের অভিযোগ

প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলা পাঁচজন পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পীর কয়েকজন জানান, নির্ধারিত পারিশ্রমিকের পুরোটা না পাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন বকেয়া থাকার ঘটনা তাঁদের জন্য নতুন নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক ছয় হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া এক অভিনেতা জানান, কখনো তাঁকে ছয় হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেও তিন-চার হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে পরবর্তী প্রজেক্টে বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়।

ওই অভিনেতার অভিযোগ, পারিশ্রমিক নিয়ে প্রতিবাদ করলে কাজ হারানোর আশঙ্কা থাকে। তাঁর দাবি, তারকাশিল্পীদের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক নিয়ে এমন সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীদের ক্ষেত্রেই বেশি সমস্যা হয়।

পার্শ্বচরিত্রের অভিনেত্রী রিমু রোজা খন্দকারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন মানুষের কাছে এখনো তাঁর পারিশ্রমিক পাওনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরেক অভিনেতা বলেন, ন্যায্য পারিশ্রমিকের পাশাপাশি বর্তমানে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বকেয়া টাকা। অনেক সময় শুটিং শেষে সম্মানী না দিয়ে পরে অফিসে গিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়। এভাবে একপর্যায়ে পারিশ্রমিক বকেয়া হয়ে যায় এবং পরে অনেকেই তা পরিশোধ করতে চান না।

আবুল হায়াতের ভিন্ন অভিজ্ঞতা

অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত বলেন, কম পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পীদের অনেকেই ঠিকমতো সম্মানী পান না বলে তিনি প্রায়ই শুনেছেন। তবে তিনি নিজে নাটক নির্মাণ ও প্রযোজনার সময় সবার পারিশ্রমিক যথাসময়ে পরিশোধ করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর ভাষ্য, শুটিং শেষ হওয়ার পর সবার সম্মানীর খাম প্রস্তুত রাখা হতো। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা না পেলেও নিজের অর্থে শিল্পীদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করেছেন। তাঁর মতে, পারিশ্রমিক বকেয়া রাখার চর্চা বন্ধ হওয়া উচিত।

‘৯৯ ভাগ অভিযোগই সমাধান করি’

অভিনয়শিল্পীদের বকেয়া ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিয়ে ছোট পর্দার শিল্পীদের সংগঠন অভিনয়শিল্পী সংঘেও নিয়মিত অভিযোগ আসে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু।

তিনি বলেন, পারিশ্রমিক নিয়ে পাওয়া অভিযোগের প্রায় সবই অন্য সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তবে রিফাত চৌধুরী অভিনয়শিল্পী সংঘের সদস্য নন বলে জানান তিনি।

রাশেদ মামুনের ভাষ্য, সদস্য না হলেও রিফাত চৌধুরী অভিযোগ করলে সংগঠনটি বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবে। তাঁর মতে, প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে শিল্পীদেরও একটি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রিফাত চৌধুরীর অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এলেও পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও বকেয়া সম্মানী নিয়ে সমস্যাটি যে দীর্ঘদিনের, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে সেটিই উঠে এসেছে।