লতা মঙ্গেশকর না আশা ভোসলে কে সেরা, তা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না সুরকার রাহুল দেববর্মনও। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মতে, আশাকে দিয়ে যেকোনো গান গাওয়ানো যায়। কিন্তু কিছু গান আবার লতা ছাড়া হয় না!’
একই প্রসঙ্গে গীতিকার ও পরিচালক গুলজার একবার বলেছিলেন, ‘চাঁদে দুটি লোক একই সঙ্গে নামল। তুমি যে প্রথম পা দিল, তাকে নিয়ে এমন নাচানাচি শুরু করলে যে অন্য লোকটার কথা ভুলেই গেলে। আরে, সে-ও তো ভাই চাঁদে একই সঙ্গে গিয়েছে!’ তাঁর সেই তুলনায় দ্বিতীয়জন ছিলেন আশা ভোসলে।
আজ কিংবদন্তি এই গায়িকার জন্মদিন। ১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া আশা ভোসলে দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। তবে শুধু গানের শিল্পী হিসেবেই নয়, ব্যক্তি আশা ভোসলে আরও বিচিত্র ও অনুপ্রেরণাদায়ক এক চরিত্র। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, সংসার, রান্না, বই পড়া আর নিরন্তর কাজের অভ্যাস, সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন নিজের গাওয়া গানের মতোই বৈচিত্র্যময়।
‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’
এক সাক্ষাৎকারে আশা ভোসলে-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন গানটি তাঁকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। হেসে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা/ইঁহা কাল ক্যায়া হো কিসনে জানা...’
সত্যিই যেন তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি এই গান। এরপর তিনি আরও একটি গানের কথা বলেছিলেন, ‘আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু।’ তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, অতীতে কী হয়েছে, ভবিষ্যতে কী হবে কেউই জানে না। তাহলে এত ভেবে কী লাভ?
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের তুমুল জনপ্রিয়তার যুগে জন্ম নেওয়াকে অনেকে তাঁর জীবনের ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু নিজের নামের মতোই আশাবাদী আশা ভোসলে কখনো সেই প্রতিকূলতাকে গুরুত্ব দেননি।
গান ও সংসার পাশাপাশি
আশা ভোসলে শুধু কিংবদন্তি গায়িকাই নন, তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর সংসারী নারী ও সফল মা। কীভাবে এত কিছু একসঙ্গে সামলেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, মানুষ যেন তাঁকে এমন একজন নারী হিসেবে মনে রাখে, যিনি সততার সঙ্গে আপ্রাণ কাজ করেছেন এবং কাজ থেকে কখনো পালিয়ে যাননি।
মঞ্চে গান গাওয়ার পরও তাঁর দায়িত্ব শেষ হতো না। স্টেজ থেকে নেমে সংসার সামলানো, নিজে রান্না করা, পরিবারের সবার খেয়াল রাখা সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে নিতেন নতুন শক্তি।
বয়স বাড়লেও কাজ থেকে দূরে থাকার পক্ষপাতী ছিলেন না আশা। নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়েও এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিক, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই। তবে হিমোগ্লোবিন কিছুটা কম থাকায় মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়তে হয়।
‘অবসর’ শব্দটাই অপছন্দ
আশা ভোসলের কাছে অবসর মানেই অলসতা। তাঁর মতে, ষাট বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই অনেকে অবসরজীবনের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। কীভাবে দুপুরে ঘুমাবেন, কীভাবে আরামে থাকবেন। কিন্তু এই ধারণা তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়।
তিনি বলেছিলেন, অসুস্থ না হলে জীবনে দুপুরে ঘুমাননি। হাতে কোনো কাজ না থাকলে ঘর পরিষ্কার করেছেন। তাঁর সাফ কথা, জীবনে থাকতে হলে সামনে তাকাতে হবে, দৌড়াতে হবে। ‘অবসর’ শব্দটিই তাঁর কাছে অরুচিকর।
বরং অবসরের আগেই নতুন করে কী কী কাজ করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পড়ার নেশা থেকে রান্নার প্রতি ভালোবাসা
ছোটবেলায় ভারতের সব ঘরে তখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সেই সময় কোনো কোনো দিন খোলা দরজা দিয়ে আসা রাস্তার বাতির আলোয় বই পড়তে পড়তে রাত কেটে যেত ছোট্ট আশার। পড়ার সেই নেশা বয়স বাড়ার পরও কমেনি।
মারাঠি সাহিত্য, মারাঠিতে অনূদিত বিভিন্ন ভাষার উপন্যাস কিংবা হিন্দি গল্প হাতে পেলে এখনো পড়েন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখিও করেছেন।
তবে গায়িকা না হলে কী হতেন? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পেশাদার রাঁধুনি হতাম। বেছে বেছে চারটা বাসায় রান্না করে প্রচুর টাকা কামাতাম। হা হা হা।’
রান্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসা বরাবরই বিশেষ। মুম্বাইয়ের বহু তারকা তাঁর রান্নার ভক্ত। কাপুর পরিবারেও তাঁর রান্না করা মাছ, পায়া কারি ও ডালের বিশেষ কদর রয়েছে বলে জানা যায়। রান্নার সেই ভালোবাসা থেকেই বিভিন্ন দেশে ‘আশাজ’ নামে রেস্তোরাঁর ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন তিনি।
জীবনের কঠিন সময়েও হার মানেননি
মঙ্গেশকর পরিবারের তৃতীয় সন্তান আশা ভোসলের ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে পালিয়ে গণপত রাও ভোসলেকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। প্রথম বিয়ে সুখের হয়নি। বিচ্ছেদের পর ১৯৮০ সালে সুরকার ও সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মনকে বিয়ে করেন আশা।
প্রায় ১৪ বছর সংসার করার পর ১৯৯৪ সালে মারা যান রাহুল দেববর্মন। এরপরও নানা কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। ছেলে হেমন্তের মৃত্যু এবং একমাত্র মেয়ে বর্ষা ভোসলের অস্বাভাবিক মৃত্যু, দুই গভীর শোকই সহ্য করতে হয়েছে এই শিল্পীকে।
এত উথাল-পাথালের পরও নিজেকে কীভাবে সামলে রেখেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আশার উত্তর ছিল আশাবাদী।
তিনি বলেছিলেন, নিজেকে বোঝাতে হবে সবার জীবনেই খারাপ ও ভালো দিন আসে। খারাপ সময়ে যতই ঝড় আসুক, নিজের জায়গা থেকে নড়ে যাওয়া যাবে না। নিজের পরিশ্রম থেকেও সরে আসা যাবে না। কারণ একদিন না একদিন সময় ঠিকই ফিরে আসে।
এই বিশ্বাসই হয়তো আশা ভোসলের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। গান তাঁকে কিংবদন্তি করেছে, কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই তাঁকে করে তুলেছে অনন্য।