২০০৭ সালে মুক্তির পর বক্স অফিসে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি ‘আওয়ারাপন’। প্রথম দিনে ছবিটির আয় ছিল প্রায় ৭৯ লাখ রুপি, আর প্রথম সপ্তাহান্তে ভারতের নিট আয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ রুপি। তখন ছবিটিকে ঘিরে ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরির সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় গল্প। টেলিভিশনে বারবার প্রচার, জনপ্রিয় গান এবং দর্শকের মুখে মুখে ‘আওয়ারাপন’ ধীরে ধীরে পেয়ে যায় কাল্ট মর্যাদা।
প্রায় দুই দশক পর মুক্তি পেয়েছে সেই ছবির দ্বিতীয় কিস্তি ‘আওয়ারাপন ২’। মুক্তির মাত্র তিন দিনেই বিশ্বব্যাপী ছবিটির আয় ১৩০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। পুরোনো একটি বক্স অফিস ব্যর্থ ছবির সিক্যুয়েল কীভাবে এমন সাড়া ফেলল, তার উত্তর সম্ভবত এক শব্দে বলা যায়, নস্টালজিয়া।
তবে শুধু পুরোনো ছবির নাম ব্যবহার করলেই নস্টালজিয়া তৈরি হয় না। ‘আওয়ারাপন ২’-এর নির্মাতারা বুঝেছেন, প্রথম ছবির কোন বিষয়গুলো দর্শকের মনে এখনো জীবন্ত। তাই শিবম পণ্ডিত, পুরোনো গান, পরিচিত সংলাপ, আবেগঘন মুহূর্ত এবং ইমরান হাশমির চেনা বিষণ্ন উপস্থিতিকে নতুন গল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
২০০৭ সালে মোহিত সুরি পরিচালিত ‘আওয়ারাপন’-এ ইমরান হাশমি অভিনয় করেছিলেন শিবম পণ্ডিত চরিত্রে। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ, আত্মত্যাগ ও বিষণ্নতায় ভরা চরিত্রটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও ‘তোহ ফির আও’ ও ‘তেরা মেরা রিশতা’র মতো গান এবং টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারের কারণে ধীরে ধীরে নতুন দর্শক তৈরি হয়। ফলে বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও ‘আওয়ারাপন’ দর্শকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি।
‘আওয়ারাপন ২’-এর সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত ছিল ইমরান হাশমিকে আবার শিবম পণ্ডিত চরিত্রে ফিরিয়ে আনা। নির্মাতারা চাইলে সম্পূর্ণ নতুন গল্প ও চরিত্র নিয়ে শুধু ‘আওয়ারাপন’ নামটি ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা পুরোনো চরিত্রকেই ফিরিয়েছেন। ফলে দর্শককে নতুন করে শিবমের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়নি। প্রায় ২০ বছর আগে তৈরি সেই সম্পর্কই নতুন ছবির আবেগের ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
নস্টালজিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে গান। ‘তোহ ফির আও’ ও ‘তেরা মেরা রিশতা’ শুধু সিনেমার গান ছিল না, সময়ের সঙ্গে এগুলো দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় কিস্তিতে পুরোনো গান ও সুরের আবহ ফিরিয়ে এনে নির্মাতারা সেই স্মৃতিকে নতুন গল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এমনকি প্রথম ছবির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচিত সংলাপ ও আবেগঘন মুহূর্তও নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ছবির শুরু থেকেই প্রথম কিস্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছে। পরিচিত সংলাপ, শিবমের অতীত এবং আলিয়ার স্মৃতি নতুন গল্পে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে দর্শকের কাছে ‘আওয়ারাপন ২’ পুরোপুরি নতুন কোনো গল্প নয়, বরং বহু বছর আগে থেমে যাওয়া একটি আবেগের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরেও পুরোনো গানের ব্যবহার দর্শকের স্মৃতিকে আরও উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে পরিচিত গানগুলো যখন গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে ফিরে আসে, তখন তা শুধু গান শোনার মুহূর্ত থাকে না, বরং পুরোনো সময়ের সঙ্গে দর্শকের আবেগের সংযোগ তৈরি করে।
‘আওয়ারাপন ২’-এর সাফল্যের আরেকটি দিক হলো, এটি শুরু থেকেই নিশ্চিত বাণিজ্যিক সাফল্যের ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং মুক্তির আগে ছবিটি নিয়ে পরিবেশকদের আগ্রহও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু মুক্তির পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০০৭ সালে দর্শককে ‘আওয়ারাপন’ খুঁজে নিতে হয়েছিল, আর ২০২৬ সালে ‘আওয়ারাপন ২’-এর জন্য দর্শকরাই অপেক্ষা করছিলেন।
এখানেই প্রথম ও দ্বিতীয় ছবির সবচেয়ে বড় পার্থক্য। প্রথম ছবিকে নিজের দর্শক তৈরি করতে হয়েছিল। দ্বিতীয় ছবির সামনে ছিল প্রায় দুই দশক ধরে তৈরি হওয়া একটি অনুগত দর্শকগোষ্ঠী। তাঁদের কাছে পুরোনো গান, সংলাপ ও শিবম পণ্ডিতের ফিরে আসাই ছিল প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার বড় কারণ।
‘আওয়ারাপন ২’-এর সাফল্য তাই শুধু একটি সিক্যুয়েলের সাফল্য নয়। এটি প্রমাণ করেছে, কোনো সিনেমা মুক্তির সময় বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেই যে সেটি দর্শকের মন থেকে হারিয়ে যায়, এমন নয়। গান, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্য দিয়ে একটি সিনেমা বহু বছর পরও নতুন দর্শক তৈরি করতে পারে।
প্রায় দুই দশক পর ‘আওয়ারাপন ২’ সেই পুরোনো আবেগের দরজায় আবার কড়া নেড়েছে। ইমরান হাশমির শিবম পণ্ডিত, পরিচিত গান ও সংলাপের মাধ্যমে দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়েছে ২০০৭ সালের সেই জগতে। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে ছবিটির বড় সাফল্যের রহস্য, বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়া আর দর্শকের মন থেকে হারিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।