বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী কবরীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন এবং শিল্প-সংস্কৃতিতে রেখে যাওয়া অসামান্য অবদান। অভিনয়, পরিচালনা, সাহিত্য ও রাজনীতি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। মৃত্যুর পরও তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতি আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।
কবরীর প্রকৃত নাম ছিল মিনা পাল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে প্রখ্যাত পরিচালক সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে জরিনা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। সে সময় প্রখ্যাত সুরকার সত্য সাহার সুপারিশে সুভাষ দত্ত তাঁর সন্ধান পান এবং কণ্ঠ ও সংলাপ পরীক্ষার পর সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘কবরী’। প্রথম চলচ্চিত্রেই অভিনয়গুণের স্বাক্ষর রেখে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন তিনি।
এরপর জহির রায়হানের ‘বাহানা’ এবং খান আতাউর রহমানের ‘সোয়ে নদীয়া জাগে পানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন। ১৯৬৮ সালে লোককাহিনিনির্ভর ‘সাত ভাই চম্পা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ছবিটি পরবর্তীতে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সেরা দশ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পায়।
কবরীর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সাধারণ মানুষের হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছে যাওয়া। তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, সরলতা এবং এক ধরনের সহজাত মাধুর্য, যা তাঁকে ‘মিষ্টি মেয়ে’ এবং ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। রূপালী পর্দায় অতিরিক্ত সাজসজ্জার পরিবর্তে তিনি বরাবরই স্বাভাবিক উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিতেন। ফলে দর্শক তাঁকে নিজের পরিবারের একজন সদস্যের মতোই আপন করে নিয়েছিল।
বাংলা চলচ্চিত্রে নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে কবরীর জুটি ছিল অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল। ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই জুটির পথচলায় দর্শক উপহার পেয়েছে ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘দীপ নেভে নাই’ এবং ‘রংবাজ’-এর মতো বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। ১৯৭০ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রে বাক-প্রতিবন্ধী তরুণীর চরিত্রে প্রায় সংলাপহীন অভিনয় তাঁর অভিনয় দক্ষতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে কিংবদন্তি নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে ‘রাজার ঝি’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। চলচ্চিত্রটি পরবর্তীতে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের তালিকায় সেরা বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি লাভ করে। এছাড়া ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ও ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে গ্রামবাংলার দর্শকদের কাছেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে কবরী অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি প্রথম বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। পরে ‘সুজন সখী’ ও ‘দুই জীবন’ চলচ্চিত্রের জন্যও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে বিশেষ সম্মাননা, আজীবন সম্মাননা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিতে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও সফল ছিলেন কবরী। ২০০৫ সালে ‘আয়না’ চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং এর জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের স্বীকৃতি অর্জন করেন। সাহিত্যচর্চাতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘স্মৃতিটুকু থাক’ পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কবরী। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েও তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের স্নেহময়ী মা।
রূপালী পর্দার এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর মিষ্টি হাসি, কালজয়ী অভিনয় এবং বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান আজও দর্শকের হৃদয়ে অম্লান। জন্মদিনে তাই কবরীকে স্মরণ মানে বাংলা চলচ্চিত্রের এক গৌরবময় অধ্যায়কে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা।