ভারতের রিয়েলিটি শো জগতে ‘লক আপ’ একটি ব্যতিক্রমী নাম। শুরু থেকেই এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং বিতর্ক, স্বীকারোক্তি এবং ব্যক্তিগত জীবনের গোপন অধ্যায় উন্মোচনের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। চার বছর বিরতির পর দ্বিতীয় মৌসুম নিয়ে ফিরেছে অনুষ্ঠানটি। তবে নতুন সিজন শুরু হলেও পুরোনো প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে, ‘লক আপ’ কি সাহসী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, নাকি বিতর্ককে পুঁজি করে তৈরি একটি বিনোদনমূলক পণ্য?

২০২২ সালে প্রযোজক একতা কাপুর যখন ‘লক আপ’-এর ঘোষণা দেন, তখন অনেকেই এটিকে ‘বিগ বস’-এর আরেক সংস্করণ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রচার শুরুর পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, অনুষ্ঠানটির কাঠামো ভিন্ন। এখানে প্রতিযোগীদের ‘বন্দী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থাকে একটি প্রতীকী ‘চার্জশিট’, যা তাদের বাস্তব জীবনের বিতর্ক, কেলেঙ্কারি বা আলোচিত ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

দ্বিতীয় মৌসুমে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। প্রথম মৌসুমে সঞ্চালকের দায়িত্বে থাকা কঙ্গনা রানাওয়াত এবার নিয়মিত হোস্ট নন। নতুন মৌসুমে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করছেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ। তবে কঙ্গনা বিশেষ পর্বে ‘জনতার কণ্ঠ’ হিসেবে উপস্থিত হয়ে প্রতিযোগীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করছেন।

আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, আগের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এবার ‘লক আপ: সাচ ইয়া সাজা’ স্ট্রিমিং হচ্ছে নেটফ্লিক্সে। ফলে দেশ-বিদেশে এর দর্শকসংখ্যা আরও বেড়েছে।

শোটির সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত অংশ হলো এর মূল নিয়ম, ‘সাচ ইয়া সাজা’ বা ‘সত্য নাকি শাস্তি’। প্রতিযোগীরা সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়লে তাদের সামনে দুটি বিকল্প থাকে। হয় জীবনের এমন কোনো গোপন সত্য প্রকাশ করতে হবে, যা আগে কখনো জনসমক্ষে বলেননি, অথবা শাস্তি মেনে নিতে হবে।

এই ধারণাই ‘লক আপ’-কে অন্য রিয়েলিটি শো থেকে আলাদা করেছে, আবার সমালোচনার কেন্দ্রেও নিয়ে এসেছে। কারণ, টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক প্রতিযোগী নিজেদের ব্যক্তিগত ট্রমা, যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ভাঙার গল্প, পারিবারিক সংকট কিংবা জীবনের অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ করতে বাধ্য হন।

সমালোচকদের অভিযোগ, অনুষ্ঠানটি মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও মানসিক আঘাতকে বিনোদনের উপাদানে পরিণত করে। অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে, ক্যামেরার সামনে এমন স্বীকারোক্তি প্রতিযোগীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

প্রথম মৌসুমে একাধিক ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিজয়ী মুনাওয়ার ফারুকি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। পুনম পাণ্ডের বিতর্কিত মন্তব্য, নিশা রাওয়ালের দাম্পত্য নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং সাইশা শিন্ডের লিঙ্গ-পরিচয় পরিবর্তনের সংগ্রামের গল্প সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

দ্বিতীয় মৌসুমও শুরু হয়েছে বিতর্ক দিয়ে। অভিনেতা রাম কাপুরের অতীত মন্তব্য নিয়ে কঙ্গনা রানাওয়াতের প্রকাশ্য সমালোচনা ভাইরাল হয়েছে। একইভাবে প্রতিযোগী আকাঙ্ক্ষা চামোলার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে দেওয়া স্বীকারোক্তিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এবারের মৌসুমে অংশ নিয়েছেন রাম কাপুর, ধীরাজ ধুপার, হর্ষদ চোপড়া, শিবাঙ্গী জোশি, শ্রেয়া কালরা, যোগেশ রাওয়াত এবং আকাঙ্ক্ষা চৌধুরীসহ আরও অনেকে। প্রতি শনিবার থেকে বুধবার রাত ৮টায় নেটফ্লিক্সে নতুন পর্ব প্রকাশ করা হচ্ছে।

যদিও কঙ্গনা এবার নিয়মিত সঞ্চালক নন, তবু তাঁর উপস্থিতি এখনো শোটির অন্যতম বড় আকর্ষণ। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই শো সব সময় নিজের সত্যকে স্বীকার করার গল্প। সেই সত্য যত অস্বস্তিকরই হোক না কেন। প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটি মূল্য আছে।’

‘লক আপ’-এর জনপ্রিয়তা এবং বিতর্ক, দুটোই সমানতালে এগিয়েছে। একদিকে এটি মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন নির্যাতন এবং সম্পর্কের জটিলতার মতো বিষয়কে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে এসব সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে প্রতিযোগিতার অংশ বানানোর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে অনেকেই।

ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনুষ্ঠানটি। নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক বিদেশি ভাষার সিরিজ তালিকায় বাংলাদেশে শীর্ষস্থানেও রয়েছে ‘লক আপ’। ফলে বিতর্ক থাকলেও দর্শক আগ্রহে ভাটা পড়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।