জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান তিন বছর পর দর্শকদের জন্য নিয়ে এসেছেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘মাস্তুল’। গত শুক্রবার মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি তেলের ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক এবং বন্দর এলাকার এক পথশিশুকে ঘিরে। তাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ভাসমান মানুষের জীবন, বিচ্ছিন্নতা, স্নেহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং টিকে থাকার সংগ্রামকে পর্দায় তুলে ধরেছেন নির্মাতা।
নূরুজ্জামান জানান, ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর তিনি অন্য একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বসে থাকার সময় একটি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে দেখে তাঁর মাথায় ‘মাস্তুল’-এর গল্পের ধারণা আসে। কয়েক দিন ধরে জাহাজটিতে যাতায়াতের মাধ্যমে গল্পটি আরও পরিপূর্ণতা পায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি চিত্রনাট্য সম্পন্ন করেন।
২০১৯ সালের মার্চে শিল্পী নির্বাচন শেষে সিনেমাটির শুটিং শুরু হয়। বাস্তব একটি তেলবাহী জাহাজেই দৃশ্যধারণ করা হয়েছে পুরো চলচ্চিত্রের বড় অংশ। নিজের অর্থায়নে নির্মাণ হওয়ায় কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে কয়েক বছর। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে চলচ্চিত্রটি সেন্সর ও সার্টিফিকেশন সনদ লাভ করে।
মুক্তির আগে ধানমন্ডির রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু। ছবিতে তিনি বৃদ্ধ পাচকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যার কোনো সংলাপ নেই। প্রদর্শনী শেষে তিনি বলেন, অভিনয় কেবল সংলাপনির্ভর নয়; চরিত্রের মানসিক যাত্রা এবং অভিব্যক্তিই একজন অভিনেতার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চরিত্র নির্বাচন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, তাঁর কাস্টিং দর্শন অত্যন্ত সরল। কল্পনায় থাকা চরিত্রের সঙ্গে যে অভিনেতার অবয়ব সবচেয়ে বেশি মিলে যায়, তাকেই তিনি নির্বাচন করেন। ‘মাস্তুল’-এর সুকানি চরিত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি অডিশন নিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। অনেক পরিচিত অভিনেতা বিবেচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দীপক সুমনকে বেছে নেওয়া হয়।
নির্মাতার বিশ্বাস, তিনি যে ধরনের সিনেমা নিজে দেখতে পছন্দ করেন, সেই ধরনের চলচ্চিত্রই নির্মাণ করা উচিত। তাঁর মতে, বাংলাদেশে এমন দর্শকের সংখ্যা হয়তো এখনও খুব বেশি নয়, তবে ধীরে ধীরে এই দর্শকশ্রেণি বাড়ছে।
বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের চলচ্চিত্রটির প্রশংসা করে বলেন, এটি অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের আবহ তৈরি করলেও ভেতরে রয়েছে শক্তিশালী ও মানবিক একটি গল্প। বিশেষ করে নদী ও বন্দরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার যে চিত্র এতে উঠে এসেছে, তা অনেক দর্শকের কাছেই নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
‘মাস্তুল’-এ আরও অভিনয় করেছেন আমিনুর রহমান ও আরিফ হাসান। সিনেমাকার প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান। শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন হুসনাইন লিঙ্কন, সংগীত পরিচালনা করেছেন চৈতন্য রাজবংশী এবং কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যুবরাজ শামীম। চলচ্চিত্রের প্রচারণামূলক গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন লাবিক কামাল গৌরব।
মুক্তির আগেই ‘মাস্তুল’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন করেছে। ৪৭তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিয়ে চলচ্চিত্রটি ‘স্পেশাল মেনশন’ সম্মাননা লাভ করে। বর্তমানে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় প্রতিদিন দুটি করে প্রদর্শনী রয়েছে। এছাড়া যমুনা ব্লকবাস্টার, লায়ন সিনেমাস এবং নারায়ণগঞ্জ সিনেস্কোপেও চলছে ‘মাস্তুল’।
অন্যদিকে একই দিনে মুক্তি পেয়েছে আরও একটি নতুন চলচ্চিত্র ‘বাপজান’। এ আর মুকুল নেত্রবাদী পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন সাদিয়া মির্জা, সোহেল ও সরল হাসমত।