মঞ্চ থেকে শুরু করে রূপালি পর্দা রোমান্স, থ্রিলার, হরর কিংবা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের প্রতিটি ঘরানায় অভিনয় করে তিনি বারবার নিজেকে ভেঙেছেন ও গড়েছেন। কাজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে যাচ্ছেন, বয়স আদতে একটি সংখ্যামাত্র! তিনি আর কেউ নন, হলিউডের মেগাস্টার নিকোল কিডম্যান। আজ ২০ জুন এই কালজয়ী অভিনেত্রীর জন্মদিন। তার সমসাময়িক অনেক উজ্জ্বল তারকাই যেখানে সময়ের নিয়মে হারিয়ে গেছেন, সেখানে ক্যারিয়ারের পরের ধাপে এসে নিকোল কিডম্যান যেন আরও বেশি দীপ্তিময়, আরও বেশি উজ্জ্বল। শুরুর দিকে কেবল ‘আবেদনময়ী তারকা’র তকমা পাওয়া এই অভিনেত্রী আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রে স্বাধীন (ইন্ডিপেনডেন্ট) ধারার সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। শুধু বড় পর্দাই নয়, গত এক দশকে ছোট পর্দার ওটিটি দুনিয়াতেও একের পর এক ব্লকবাস্টার টিভি সিরিজ উপহার দিয়ে মাত করে রেখেছেন তিনি। আজ তার জন্মদিনে আলো ফেলা যাক এই গুনী অভিনেত্রীর বর্ণিল জীবন ও ক্যারিয়ারের ওপর।

লাজুক মেয়ের শুরুর গল্প ১৯৬৭ সালের ২০ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের হনলুলুতে জন্ম নেন নিকোল কিডম্যান। তবে তার মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। বাবা অ্যান্টনি কিডম্যান ছিলেন একজন প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক এবং মা জ্যানেল অ্যান ছিলেন নার্সিং প্রশিক্ষক, যিনি নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নিকোলের জন্ম আমেরিকায় হলেও তার পুরো শৈশব ও কৈশোর কেটেছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে।

ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব লাজুক স্বভাবের ছিলেন নিকোল। স্কুলজীবনে এসে নাটক ও নাচের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ তৈরি হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও অভিনয় জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পথটা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কৈশোরে ব্যালে ও অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি সিডনির বিভিন্ন থিয়েটার কর্মশালায় অংশ নিতে শুরু করেন। তবে তখন কেউ ভাবতেও পারেনি, এই লম্বা আর লাজুক মেয়েটিই একদিন বিশ্ব কাঁপানো তারকা হবেন। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এতটাই তীব্র ছিল যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। ১৯৮৩ সালে ‘বুশ ক্রিসমাস’ ছবির মাধ্যমে শুরু হয় তার পেশাদার রূপালি সফর। তবে ১৯৮৯ সালের থ্রিলার ছবি ‘ডেড কাম’ ও ‘ব্যাংকক হিলটন’ সিরিজ তাকে প্রথম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি এনে দেয়।

হলিউডে অভিষেক ও ক্রুজের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে অস্ট্রেলিয়ার থ্রিলার ‘ডেড কাম’-এ নিকোলের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন হলিউড সুপারস্টার টম ক্রুজ। তিনি নিজেই নিকোলকে তার ‘ডেজ অব থান্ডার’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন এবং এই ছবির মাধ্যমেই হলিউডে অভিষেক ঘটে কিডম্যানের। সিনেমার সেটেই শুরু হয় টম ও নিকোলের প্রেম, যা জলদি গড়ায় বিয়েতে। ১৯৯০ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই তারকা দম্পতির প্রেম-সংসার ছিল তৎকালীন বিশ্ব মিডিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। পরবর্তীতে এই জুটি একসঙ্গে বেশ কয়েকটি কালজয়ী সিনেমায় স্ক্রিন শেয়ার করেছেন।

আবেদনময়ী ইমেজ থেকে স্বাধীন সিনেমার মুখ ১৯৯৯ সালে কিংবদন্তি নির্মাতা স্ট্যানলি কুবরিকের ‘আইজ ওয়াইড শাট’ সিনেমায় তৎকালীন স্বামী টম ক্রুজের সঙ্গে অভিনয় করেন নিকোল কিডম্যান। সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ঘরানার এই সিনেমাটিতে নিকোলের সাহসী ও আবেদনময়ী উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ দৃশ্যের কারণে সিনেমাটি তখন আমেরিকায় কেবল ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সীদের দেখার জন্য ‘R’ রেটিংয়ের সনদ পেয়েছিল।

টম ক্রুজের সঙ্গে প্রায় এক দশকের সংসার জীবনের পর ২০০১ সালে আকস্মিকভাবে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে তারা প্রকাশ্যে খুব একটা মুখ না খুললেও নিকোল পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন, এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও কষ্টদায়ক একটি অধ্যায়। টম ক্রুজের সংসারে থাকার সময় তারা দুটি সন্তান দত্তক নিয়েছিলেন ইসাবেলা ও কনর। ২০০৫ সালে তাদের এই বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক আইনি সমাপ্তি ঘটে।

২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজেকে হলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন নিকোল। এর আগে ‘মুলাঁ রুজ!’, ‘দ্য আদার্স’, ‘দ্য আওয়ার্স’ এর মতো সিনেমা করে প্রশংসিত হলেও পরের বছরগুলোতে তিনি ‘বার্থ’, ‘দ্য ইন্টারপ্রেটার’, ‘অস্ট্রেলিয়া’, ‘র‍্যাবিট হোল’ ও ‘বেইউইচড’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের অংশ হন।

শুরুর দিকে মূলত বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার দিকে ঝুঁকলেও, ২০১০ সালের পর থেকে নিকোল স্বাধীন ঘরানার (ইন্ডিপেনডেন্ট) নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন এবং সমালোচকদের প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠেন। এই সময়ে তার অভিনীত ‘ট্রেসপাস’, ‘হেমিংওয়ে অ্যান্ড গেলহর্ন’, ‘দ্য পেপারবয়’, ‘লায়ন’ এবং ‘দ্য বেগাইল্ড’ সিনেমা ও সিরিজগুলো বেশ আলোচিত হয়। একই সঙ্গে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘বিগ লিটল লাইজ’, ‘দ্য আনডুয়িং’, ‘নাইন পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জারস’, ‘লাভ অ্যান্ড ডেথ’ এবং ‘দ্য পারফেক্ট কাপল’ এর মতো মেগা সিরিজগুলো তাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার (নেট ওার্থ) বিপুল সম্পদের মালিক এই অভিনেত্রী হলিউডের সবচেয়ে ধনী তারকাদের একজন।

নারী পরিচালকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার হলিউডে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে ২০১৭ সালে একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছিলেন নিকোল কিডম্যান। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, প্রতি দেড় বছরে তিনি অন্তত একজন নারী নির্মাতার সিনেমায় অভিনয় করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি মেনেই ২০২৪ সালে ডাচ নারী নির্মাতা হেলিনা রেজিনের ‘বেবিগার্ল’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি, যা ছিল সেই বছরের অন্যতম সেরা ও বহুল প্রশংসিত সিনেমা।

নতুন সম্পর্কেও ভাঙন টম ক্রুজের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০০৫ সালে অস্ট্রেলীয় কান্ট্রি গায়ক কিথ আরবানের প্রেমে পড়েন নিকোল। ২০০৬ সালের ২৫ জুন সিডনিতে ধুমধাম করে বিয়ে করেন তারা। কিথকে নিজের জীবনের ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করতেন নিকোল। এই সংসারে তাদের সানডে রোজ ও ফেইথ মার্গারেট নামে দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের এই সাজানো সংসারও টেকেনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিকোল আদালতে বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন। অবশ্য মামলা করার আগেই এই দম্পতি নিজেদের সম্পদ ও দুই কন্যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে আইনগতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন।