প্রথম সিনেমার নায়িকা হিসেবে কাজ করা স্নিগ্ধা চৌধুরীর জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও। তাঁর মতে, এই জায়গাটা সব সময়ই কঠিন। বছরে খুব বেশি সিনেমা তৈরি হয় না, অথচ অভিনয়শিল্পী অনেক। তাই নিয়মিত সিনেমায় কাজ করে যাওয়া সহজ নয়। তবে দেশের অন্যতম সেরা একজন নির্মাতার সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য বড় প্রাপ্তি। তিনি মনে করেন, যেকোনো সিনেমায় নাম যুক্ত করা যায় না। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় ভাবনা হলো, দর্শক প্রথম সিনেমায় তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করবেন। তবে নিজের জায়গা থেকে তিনি সব সময়ই আশাবাদী।
মডেলিং থেকে সিনেমায় আসার যাত্রাটাও সহজ ছিল না বলে জানান স্নিগ্ধা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি মডেলিং করছেন। এই জগতে পা রাখার পর থেকেই শুনে আসছেন, মডেলরা নাকি ভালো অভিনয় করতে পারেন না। এই ধারণাটা ভাঙতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, হলিউড ও বলিউডের অনেক তারকাই মডেলিং থেকে অভিনয়ে এসেছেন। তাই তিনিও চেষ্টা করতে চেয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক মডেল শুরুতেই ধরে নেন যে অভিনয় তাঁদের দিয়ে হবে না। স্নিগ্ধা মনে করেন, কোনো কাজ শুরু করার আগেই যদি ব্যর্থতার ভয় আসে, তাহলে সফল হওয়া কঠিন। তাই তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
পরিচালক রায়হান রাফীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ হয় এবং সিনেমা নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। একসময় একটি চরিত্রের জন্য তাঁকে পছন্দ করেন রাফী। এভাবেই প্রথম সিনেমায় যুক্ত হওয়া। সিনেমাটির জন্য তাঁকে নিয়মিত গ্রুমিং করতে হয়েছে। শুটিংয়ের সময় তিনি বুঝতে পেরেছেন, কেন রাফীকে সেরা নির্মাতাদের একজন বলা হয়। কারণ শুটিংয়ে তিনি সব সময়ই সেরাটা আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পুরো শুটিং প্রক্রিয়াই ছিল বেশ কঠিন।
মডেলিং ও সিনেমার মধ্যে ভালোবাসার জায়গা নিয়ে স্নিগ্ধা বলেন, তাঁর প্রথম ভালোবাসা মডেলিং। তাঁর ভাষায়, প্রথম প্রেম তো ভোলা যায় না। তবে সিনেমাকেও সমানভাবে ভালোবাসেন তিনি। দুটোকে ব্যালান্স করেই এগিয়ে যেতে চান। কারণ বাংলাদেশে বেশির ভাগ সিনেমাই ঈদকে কেন্দ্র করে মুক্তি পায়। বছরে সিনেমার সংখ্যা কম, আর নায়িকার সংখ্যা অনেক। তাই বাকি সময়টা কী করবেন, সে চিন্তা থেকেই মডেলিং ও সিনেমা দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে যেতে চান তিনি।
মডেলিংয়ে আসার গল্পটাও তাঁর কাছে বিশেষ। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রচুর ফ্যাশন টিভি দেখতেন। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই নিজেকে মডেল হিসেবে কল্পনা করতেন। বন্ধু ও পরিবারের অনেকেই তাঁকে মজা করে ‘ক্যাটরিনা কাইফ’ বলে ডাকতেন, যা পরে তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। উচ্চতা ও গায়ের রঙের কারণে এখনো অনেকে তাঁকে এই নামেই ডাকেন। তাঁরও মনে হতো, ক্যাটরিনা কাইফের মতো হতে হবে। এই অভিনেত্রী তাঁকে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলে জানান স্নিগ্ধা।
পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার বিষয়ে তিনি জানান, তাঁর জন্ম রংপুরে। পরে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় আসেন। ও লেভেল ও এ লেভেল শেষ করার পর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। যদিও এখনো মাস্টার্স করা হয়নি, ব্যস্ততার কারণেই তা সম্ভব হয়নি। তবে পড়াশোনা একেবারে ছেড়ে দিতে চান না তিনি। তাঁর বিশ্বাস, চেহারা বা ক্যারিয়ার সব সময় একই থাকবে না। তাই জীবনে আরও কিছু করার ইচ্ছা তিনি ধরে রাখতে চান।
এই কারণেই তিনি সব সময় ক্যারিয়ারের জন্য একটি ‘প্ল্যান বি’ রেখেছেন। তাঁর মতে, জীবনে কখন কী ঘটে বলা যায় না। বিকল্প পরিকল্পনা থাকলে আফসোস কম থাকে। তবে অভিনয়ের প্রতিই তাঁর টান বেশি। তিনি প্রায়ই একটি সংলাপ মনে রাখেন, মন থেকে কিছু চাইলে তা একদিন না একদিন পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত জীবনে যা চেয়েছেন, তার অনেকটাই তিনি পেয়েছেন বলে মনে করেন।
স্নিগ্ধার মতে, তিনি প্রথমে মডেলিং করতে চেয়েছিলেন এবং সেটি করতে পেরেছেন। এখন সিনেমায় অভিনয় করছেন। পাশাপাশি একটি সুন্দর জীবন এবং ভালো মানুষের সঙ্গও তিনি চেয়েছিলেন, সেটিও পেয়েছেন। মিডিয়ায় টিকে থাকা কঠিন হলেও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সংগ্রামও তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। তাই তিনি মনে করেন, তাঁর জীবনটা সুন্দর।
তবে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা যে একেবারেই নেই, তা নয়। কাজের পরিসর কম, সিনেমার সংখ্যা কম, আর প্রতিযোগিতা অনেক। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা আসে। কত দূর এগোতে পারবেন, কতটা সাফল্য আসবে, এসব প্রশ্ন তাঁকে ভাবায়। তবুও তিনি নিজেকে আশাবাদী মানুষ বলে মনে করেন। খুব বেশি আগাম চিন্তা করে অসুস্থ হতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন, যা অনেকেই দীর্ঘদিন কাজ করেও পান না। তাই নিজেকে সফল মনে করেন তিনি।
শুটিং না থাকলে সময় কাটানোর নিজস্ব একটি রুটিন রয়েছে তাঁর। তখন তাঁকে বাসায় পাওয়া কঠিন। বেশির ভাগ সময় কাটে জিমে। নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যায়াম করেন তিনি। এরপর বাসায় ফিরে পড়াশোনা করেন, নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও দেন এবং কাজ নিয়েও আলোচনা করেন।
সম্প্রতি যে সিনেমাটি তাঁর ভালো লেগেছে, সেটি হলো কঙ্কনা সেন অভিনীত ‘অ্যাকিউজড’। নারীকেন্দ্রিক এই সিনেমার গল্প একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ঘিরে এগিয়েছে। মানবিক দিক থেকে গল্পটি তাঁকে খুব স্পর্শ করেছে। তাঁর মতে, সিনেমাটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে। কঙ্কনা তাঁর পছন্দের অভিনেত্রীদের একজন। এ ছাড়া তাঁর সব সময়ের প্রিয় সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’।
বর্তমানে তিনি মূলত নিজের নতুন সিনেমার প্রচারণা নিয়েই ব্যস্ত। পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে কয়েকটি ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবেও কাজ করছেন। এ ছাড়া আরও দুটি সিনেমা নিয়ে আলোচনা চলছে। যেহেতু তিনি বড় পরিচালকের ভালো গল্পের সিনেমায় কাজ করেছেন, তাই পরবর্তী কাজের ক্ষেত্রেও ভালো গল্প ও শক্তিশালী চরিত্রকে প্রাধান্য দিতে চান। ঈদের পর নতুন সিনেমা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্নিগ্ধা চৌধুরী।