পুজোর আগে দিদিমা সুচিত্রা সেনের শিফন শাড়ি আর ঐতিহাসিক জড়োয়ার দুলে সেজেছেন নাতনি রাইমা সেন। অন্যদিকে, মায়ের ব্যবহার করা শাড়ি পরেছেন মুনমুন সেন। প্রিয়জনের স্মৃতি আর ভালোবাসা আগলে রেখে দেবীপক্ষের আগে অন্যরকম এক মাতৃবন্দনায় মেতেছে সুচিত্রা সেনের পরিবার।

কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান প্রিয়জনের স্মৃতিতে। তাঁদের ছোঁয়া রয়ে যায় পুরোনো আসবাব, দেয়ালে টাঙানো ছবি কিংবা আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখা শাড়ির ভাঁজে। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনও যেন তেমনই একজন। পর্দার আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে কাটিয়েছেন জীবন। তবে পরিবারের কাছে তিনি আজও স্নেহময়ী মা, আদরের ‘আম্মা’।

সুচিত্রা সেনের সাজপোশাকে ছিল নিজস্ব রুচি ও স্বকীয়তা। সাধারণ টাঙাইল কিংবা সুতির শাড়িতেও ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে পারতেন তিনি। বিশেষ দিনগুলোতে শাড়ির সঙ্গে গয়নার সামঞ্জস্য এবং সাজের পরিপাট্যে তৈরি হতো তাঁর স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। সেই রুচির উত্তরাধিকার যেন বহন করছেন মেয়ে মুনমুন সেন ও নাতনি রাইমা সেন।

সম্প্রতি মায়ের ব্যবহার করা নীল শাড়ি পরে স্মৃতিচারণ করেছেন মুনমুন। অন্যদিকে, রাইমার পরনে ছিল দিদিমার একটি শিফন শাড়ি। একরঙা শাড়িটিতে সুচিত্রা নিজেই আলাদা করে বেনারসি পাড় বসিয়েছিলেন। রাইমার কানে ছিল আম্মার নকশা করা জড়োয়ার দুল। সত্তরের দশকে একটি প্রিমিয়ারে যে গয়না পরে দেখা গিয়েছিল সুচিত্রা সেনকে, বহু বছর পর সেই অলংকারই শোভা পেয়েছে তাঁর নাতনির কানে।

দেয়ালে টাঙানো সাদা-কালো ছবির সুচিত্রা আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাইমা দুই প্রজন্মের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য সেতু। সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সাজপোশাক, রুচি আর স্মৃতি আজও বেঁচে আছে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে।

সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক উঠে এসেছে মুনমুনের স্মৃতিচারণে। বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন থেকে বিসর্জন সবকিছুতেই সক্রিয় থাকতেন মহানায়িকা। উৎসবের দিনগুলোতে নতুন পোশাক পরা, নিয়ম মেনে পুজো করা এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুনমুনের স্মৃতিতে, সুচিত্রা নিজেই বিসর্জনে যেতেন। সেই উৎসবমুখর দিনগুলোর কথা আজও মনে উজ্জ্বল।

শুধু সাজপোশাক কিংবা উৎসব নয়, সংসারের প্রতিটি বিষয়েও ছিল সুচিত্রার নিজস্ব নিয়ম। বাড়িতে অতিথি এলে সুন্দর ট্রেতে চায়ের পট সাজিয়ে পরিবেশন করার রীতি ছিল। বাড়ির কাজকর্ম ঠিকমতো চলছে কি না, ব্যস্ততার মধ্যেও ফোন করে খোঁজ নিতেন তিনি। মেয়ের সাজপোশাক নিয়েও দিতেন পরামর্শ।

মুনমুনের স্মৃতিতে উঠে এসেছে মায়ের শাসন ও স্নেহের নানা গল্প। বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে দেরিতে বাড়ি ফিরলে রাগ করতেন সুচিত্রা। আবার মায়ের মন ভালো করতে কখনো বাড়িতে আলপনা দিয়ে রাখতেন মুনমুন। এমন ছোট ছোট স্মৃতিতেই ধরা পড়ে পর্দার মহানায়িকার ঘরোয়া জীবনের অন্য এক রূপ।

রাইমা ও রিয়ার সঙ্গেও সুচিত্রার সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। বিশেষ করে রাইমার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন তিনি। দুজনের মধ্যে গল্প হতো, গড়ে উঠেছিল আপন এক জগৎ। অভিনয়জগতের কিংবদন্তি পরিচয়ের বাইরে পরিবারের কাছে সুচিত্রা ছিলেন নিয়মপ্রিয়, রুচিশীল এবং প্রিয়জনদের প্রতি গভীরভাবে যত্নশীল একজন মানুষ।

মায়ের গয়না সাধারণত খুব বেশি পরেন না মুনমুন। তবে হাতে থাকা সোনার চুড়িগুলো সব সময় পরে থাকেন। সূক্ষ্ম নকশার সেই চুড়ি যেন মায়ের সঙ্গে তাঁর নীরব সম্পর্কের প্রতীক। অন্যদিকে, রাইমার কানে শোভা পাওয়া জড়োয়ার দুলও কেবল একটি অলংকার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক কিংবদন্তির ব্যক্তিগত রুচি, চলচ্চিত্রজগতের স্মৃতি ও পরিবারের আবেগ।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বালিগঞ্জের সেই বাড়ির চেহারা, যেখানে একসময় সুচিত্রা সেনের সংসার ছিল। পুরোনো বাংলোর জায়গায় গড়ে উঠেছে বড় আবাসন। কিন্তু ঠিকানা বদলালেও স্মৃতির আবাস বদলায়নি। দেয়ালে সাজানো সুচিত্রার বিভিন্ন বয়সের ছবি, পুরোনো আসবাব ও ব্যক্তিগত স্মারকের মধ্য দিয়ে আজও অনুভব করা যায় তাঁর উপস্থিতি।

পর্দায় সুচিত্রা সেন ছিলেন সৌন্দর্য ও অভিনয়ের এক অনন্য নাম। আর পরিবারের স্মৃতিতে তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পেত শাসন, যত্ন, রুচি ও ছোট ছোট অভ্যাসের মধ্য দিয়ে। পুজোর আগে তাঁর শাড়ি-গয়নায় মেয়ে ও নাতনির সেজে ওঠা যেন সেই ভালোবাসা আর উত্তরাধিকারেরই এক আবেগঘন প্রকাশ।