গ্র্যামিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান সংগীতশিল্পী টাইলা তার আসন্ন বিশ্ব সফরের হালনাগাদ সূচি থেকে নাইজেরিয়ার লাগোস শহরের নাম সরিয়ে দেওয়ায় নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। যদিও এ সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে টাইলা বা তার টিম এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিবিদ্বেষী হামলা নিয়ে চলমান বিতর্কের সঙ্গে বিষয়টির যোগসূত্র খুঁজছেন অনেকেই।
সোমবার নিজের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘এ পপ’ প্রকাশের পর শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব সফরের সূচি প্রকাশ করেন টাইলা। প্রথম ঘোষিত তালিকায় ৩৪টি শহরের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ ও কেপ টাউনের পাশাপাশি নাইজেরিয়ার লাগোসও ছিল। তবে শুক্রবার প্রকাশিত হালনাগাদ সূচিতে লাগোসের নাম আর দেখা যায়নি।
এই পরিবর্তনের কারণ নিয়ে কোনো মন্তব্য না এলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদেশিবিদ্বেষী হামলার ঘটনায় অনেক নাইজেরিয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে টাইলা প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেননি।
নাইজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত নাইজেরিয়ান নাগরিকরা বিদেশিবিদ্বেষী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। শুধু নাইজেরিয়া নয়, আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনও জোরদার হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা কাগজপত্রবিহীন বিদেশিদের দেশত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী টাইলাকে নাইজেরিয়ায় অনুষ্ঠান না করার আহ্বান জানান। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিবিদ্বেষী হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাকে নাইজেরিয়ায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার দাবিতে একটি অনলাইন আবেদনও চালু করা হয়। এতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ সমর্থন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
যদিও টাইলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু প্ল্যাটফর্মে এখনও আগের সফরসূচি দেখা যাচ্ছে, সেখানে বহু নাইজেরিয়ান ভক্ত মন্তব্য করে তাকে অনুষ্ঠান না করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বিদেশিবিদ্বেষের ঘটনায় নীরব থাকার জন্যও সমালোচনা করেছেন।
এ ধরনের সমালোচনার মুখে শুধু টাইলাই নন। দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ট্রেভর নোয়াও সম্প্রতি একই ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পর্যটন প্রচারণামূলক একটি ভিডিওতে অংশ নেওয়ার পর অনেকেই অভিযোগ করেন, তিনি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন, কিন্তু বিদেশিবিদ্বেষী সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, নিজ দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটের জন্য একজন শিল্পীকে কতটা দায় বহন করতে হবে? নাইজেরিয়ার অধিকারকর্মী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ওমোইয়েলে সোওরে মনে করেন, বিদেশিবিদ্বেষের জন্য ক্ষোভ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে থাকা উচিত, শিল্পীদের দিকে নয়। তার মতে, রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় শিল্পীদের ওপর চাপানো যৌক্তিক নয়, যদি না তারা সরাসরি এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন।
নাইজেরিয়ার সংস্কৃতিবিষয়ক সাংবাদিক মায়োওয়া ইদোউও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করার ইচ্ছা থাকলেও শিল্পীদের লক্ষ্যবস্তু বানালে মূল সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যেতে পারে। শুধু জাতীয়তার কারণে কোনো শিল্পীর ওপর রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি করাও উচিত নয়।
টাইলা এর আগেও নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাংস্কৃতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনায় ছিলেন। চলতি বছর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো গ্র্যামির ‘বেস্ট আফ্রিকান মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগে পুরস্কার জেতেন। সেই বিভাগে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় শিল্পী। এর আগে ২০২৪ সালেও বার্না বয় ও ডেভিডোর মতো তারকাদের পেছনে ফেলে একই পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবাদিক থানগো এনটওয়াসার মতে, লাগোস সফরসূচি থেকে বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন আফ্রিকাজুড়ে শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, শিল্পীরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাইতে পারেন, কিন্তু জনপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে তাদের অবস্থান বা নীরবতাও অনেক সময় জনমতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।