২০০৮ সালের সেই সকালটা আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। প্রিয় নায়ক মান্নার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সারা দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। ঢাকার রাজপথ যেন মুহূর্তেই বদলে যায়। শেষবারের মতো তাকে দেখতে লাখো মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। এফডিসি থেকে মরদেহবাহী গাড়ি বের হওয়ার সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে টিয়ারশেল ছুড়তে হয়েছিল। দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কোনো তারকার বিদায়ে এমন জনসমাগম খুব কমই দেখা গেছে। মানুষের সঙ্গে কতটা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুললে এমন আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে, মান্নার বিদায় সেটাই প্রমাণ করে।

তখন আজকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। টেলিভিশন আর বেতারেই ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর খবর। আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আপনজন। টিভি চ্যানেলগুলোতে যখন তার অভিনীত সিনেমা ‘মনের সাথে যুদ্ধ’-এর গান ‘আসবার কালে আসলাম একা’ প্রচার হচ্ছিল, অনেকের চোখেই পানি এসেছে। গানটি ছিল মান্নার নিজেরও প্রিয়।

মান্না বাঁচতে চেয়েছিলেন আরও অনেকদিন। ভক্তরাও চেয়েছিলেন তাকে দীর্ঘদিন পাশে রাখতে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। অভিনয় জীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র। ‘আম্মাজান’-এর বাদশা, ‘দাঙ্গা’-র সংগ্রামী যুবক কিংবা ‘কষ্ট’-এর প্রেমিক চরিত্র। প্রতিটি ভূমিকায় তিনি ছাপ রেখে গেছেন দর্শকের হৃদয়ে। এজন্যই তাকে বলা হতো ‘গণমানুষের নায়ক’। পর্দার নায়ক হলেও বাস্তবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের একজন, কারও সন্তানের মতো, কারও ভাই, কারও স্বপ্নের মানুষ।

তবে আলোঝলমলে দুনিয়ার আড়ালেও তার ছিল নিজস্ব উপলব্ধি। তিনি একবার বলেছিলেন, চলচ্চিত্র অঙ্গন অনেকটাই স্বার্থনির্ভর, এখানে নিখাদ ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার সেই মন্তব্য আজও শিল্পীদের ভাবায়।

১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া আসলাম তালুকদার, যিনি পরে মান্না নামে পরিচিত হন, ১৯৮৪ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। ১৯৮৫ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘পাগলী’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক। তবে ১৯৯২ সালের ‘দাঙ্গা’ তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি। এরপর ‘তেজি’, ‘কে আমার বাবা’, ‘আম্মাজান’‘লাল বাদশা’ একটির পর একটি ব্যবসাসফল সিনেমা তাকে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও ছিলেন সফল। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্তি পায় ‘লুটতরাজ’, ‘স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ’ ও *‘পিতা-মাতার আমানত’*সহ একাধিক হিট সিনেমা।

১৮তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে মান্না ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল ও কোরআন খতমের আয়োজন করা হয়েছে। তার সহধর্মিণী ও ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন শেলী মান্না জানিয়েছেন, দেশজুড়ে মানুষ যে ভালোবাসা তাকে দিয়েছেন, সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মৃত্যুবার্ষিকীতে সবার কাছে তিনি দোয়া চেয়েছেন।