বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি ছিলেন ববিতা ও জাফর ইকবাল। একসঙ্গে প্রায় ৪০টি সিনেমায় অভিনয় করা এই দুই তারকার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ছিল দর্শক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে। এবার সেই সম্পর্কের নানা অজানা দিক তুলে ধরেছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ববিতা অকপটে স্বীকার করেন, জাফর ইকবালের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল। একইভাবে জাফর ইকবালও তাঁকে ভালোবাসতেন। তবে তাদের সম্পর্ক কখনো বিয়ের পরিকল্পনা বা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ববিতার ভাষায়, খুব অল্প বয়সে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই বন্ধুত্ব থেকেই জন্ম নেয় ভালো লাগা, পরে ভালোবাসা। তিনি বলেন, জাফর ইকবাল ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন, স্মার্ট, ভদ্র এবং প্রতিভাবান একজন মানুষ। অভিনয়ের পাশাপাশি গান, গিটার বাজানো এবং ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন।
ববিতা জানান, শুটিংয়ের বাইরে তাদের সময় কাটত মূলত গান ও আড্ডায়। জাফর ইকবাল তাকে গিটার বাজিয়ে গান শিখাতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুজনকে একসঙ্গে গান গাইতেও দেখা যেত। দর্শকদের কাছেও তারা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জুটি।
‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী, হয়ে কারও ঘরণী’ গানটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে গুঞ্জন ছিল, সেটিও পরিষ্কার করেছেন ববিতা। অনেকেই মনে করতেন, তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে জাফর ইকবাল গানটি গেয়েছিলেন। তবে ববিতার দাবি, বিষয়টি তেমন ছিল না। জাফর ইকবাল নিজেই তাকে জানিয়েছিলেন, গানটির সুরকার আলাউদ্দিন আলী এবং গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির পরিকল্পনা করেই তাকে দিয়ে গানটি গাইয়েছিলেন, যাতে দর্শকরা সেটিকে ববিতার সঙ্গে তার সম্পর্কের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবেন।
সম্পর্কের বিষয়ে ববিতা বলেন, ভালোবাসা ছিল, কিন্তু কোনো ধরনের কমিটমেন্ট ছিল না। একসময় তারা দুজনই নিজ নিজ ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জাফর ইকবাল অন্য নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন, আর ববিতা রাজ্জাক, ফারুকসহ অন্যান্য নায়কদের সঙ্গে বেশি কাজ করেন। ফলে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হলেও বন্ধুত্ব কখনো শেষ হয়নি।
জাফর ইকবালের জীবনের শেষ সময়ের স্মৃতিও তুলে ধরেন ববিতা। তিনি জানান, শেষ দিকে জাফর ইকবালকে অনেকটা অগোছালো এবং অসুস্থ দেখাত। একসঙ্গে একটি সিনেমার শুটিংয়ের সময় তিনি জাফর ইকবালের শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। পরে জানতে পারেন, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।
ববিতা বলেন, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পেলেও নানা কারণে তাকে দেখতে যাওয়া হয়নি। এরপর একদিন শুনতে পান, জাফর ইকবাল আর নেই। পরে এফডিসিতে আনা তার মরদেহ দেখতে গিয়ে শেষবারের মতো প্রিয় সহশিল্পীকে দেখেছিলেন তিনি।
প্রেম, বন্ধুত্ব, অভিমান আর শ্রদ্ধার মিশেলে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক আজও ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। আর বহু বছর পর সেই স্মৃতিগুলো নতুন করে সামনে এনে আবেগঘন এক অধ্যায়ের কথা স্মরণ করলেন ববিতা।