তারকা, সুপারস্টার আর সত্যিকারের শিল্পী, এই তিন পরিচয়ের মধ্যে নানা পাটেকর নিজেকে কখনোই শুধু ‘তারকা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে চরিত্র ও অভিনয়ের শক্তিতেই নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। হিন্দি সিনেমায় প্রচলিত নায়কের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁর মতো অভিনেতার উত্থান পরবর্তী প্রজন্মের অনেক শিল্পীর জন্য নতুন পথ তৈরি করে।
বিশ্বনাথ পাটেকর নামে ১৯৫১ সালে জন্ম নেওয়া নানা অভিনয়ে পা রাখেন ১৯৭৮ সালের মারাঠি সিনেমা ‘মিমাগামন’-এর মাধ্যমে। শুরুটা ছিল একেবারেই নীরব। বড় পোস্টার, তারকাসুলভ প্রচারণা কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেকের বদলে ধীরে ধীরে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকের নজরে আসেন তিনি। মারাঠি সিনেমায় কাজের পর ব্রিটিশ টেলিভিশন সিরিজ ‘Lord Mountbatten: The Last Viceroy’-এ নাথুরাম গডসের ছোট চরিত্রেও অভিনয় করেন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দি সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ‘Aaj Ki Awaz’ ও ‘Ankush’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় তাঁকে আলাদা করে পরিচিত করে। বিশেষ করে ‘Ankush’-এ তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয়, দ্রুত সংলাপ বলার ধরন ও গভীর দৃষ্টি পর্দায় এমন এক ব্যক্তিত্ব তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে ‘নানা পাটেকর’ নামের নিজস্ব অভিনয়ধারার অংশ হয়ে ওঠে।
মীরা নায়ারের ‘Salaam Bombay!’ সিনেমাতেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। এরপর ‘Parinda’ সিনেমার জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। তবে ‘পার্শ্ব অভিনেতা’ পরিচয়ে আটকে থাকতে চাননি নানা। বড় সিনেমায় আরও বিক্রিযোগ্য তারকার পাশে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেই নিজের অবস্থান বদলের চেষ্টা করেন।
১৯৯১ সালে ‘Prahaar’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন নানা। সিনেমাটিতে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার দায়িত্বও নেন তিনি। বক্স অফিসে মাঝারি সাফল্য পেলেও পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনে সিনেমাটি কাল্ট মর্যাদা পায়।
এরপর ‘Tiranga’ ও ‘Krantiveer’ তাঁকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতায় পরিণত করে। ‘Tiranga’-তে রাজ কুমারের সঙ্গে এবং ‘Krantiveer’-এ এক বিদ্রোহী ন্যায়রক্ষকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। ‘Krantiveer’-এর জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান তিনি। এবার আর তিনি পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা নন, ছিলেন সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে।
নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর দশকে ছোট বাজেটের সিনেমা থেকে বড় বাণিজ্যিক ছবির পার্শ্ব চরিত্র, দুই ক্ষেত্রেই সমান স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন নানা। ‘হিরো’ নাকি ‘চরিত্রাভিনেতা’, তাঁকে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০০৪ সালের ‘Ab Tak Chhappan’ সিনেমায় বড় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আবারও নিজের অভিনয়ক্ষমতার প্রমাণ দেন।
শুধু গম্ভীর চরিত্রেই নয়, কমেডিতেও নানা পাটেকরের দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘Bluffmaster’, ‘Phir Hera Pheri’ ও ‘Hattrick’-এর পর ২০০৭ সালের ‘Welcome’ সিনেমায় উদয় শেঠি চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। চরিত্রটি আইকনিক হয়ে ওঠার পাশাপাশি নানা প্রমাণ করেন, তাঁর অভিনয়ের পরিসর কেবল গম্ভীর বা বিদ্রোহী চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে বিতর্কও ছিল। ২০০৮ সালে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত ‘Horn ‘Ok’ Pleassss’ সিনেমার সেটে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। ২০১৩ ও ২০১৮ সালেও একই অভিযোগ পুনরায় করেন তিনি। নানা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০১৮ সালে #MeToo আন্দোলনের সময় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে পুলিশের বি-সামারি প্রতিবেদনে অভিযোগটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিশোধমূলক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় এবং নানা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
‘Yehswant’ সিনেমার একটি দৃশ্য নিয়েও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সহশিল্পী মাধু দাবি করেছিলেন, একটি দৃশ্যের সময় পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই নানা তাঁকে চড় মেরেছিলেন। নানার বক্তব্য ছিল, দৃশ্যের প্রয়োজনেই সেটি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মাধু জানান, ঘটনাটি তাঁর কাছে পেশাগত সীমারেখা অতিক্রমের মতো মনে হয়েছিল।
তবে এসব বিতর্ক তাঁর অভিনয়জীবনের গতি থামাতে পারেনি। ২০১০-এর দশকেও ‘Rajneeti’, ‘Natsamrat’ ও ‘Ab Tak Chhappan 2’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসা পান তিনি। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়েও চরিত্র বাছাইয়ে বৈচিত্র্য ধরে রেখেছিলেন এই অভিনেতা।
বিশাল ভরদ্বাজের ‘O’Romeo’ সিনেমায় নানা পাটেকরকে শেষবারের মতো দেখা যায়। ২০২৬ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে তিনি অভিনয় করেন খামখেয়ালি ও অনির্দেশ্য স্বভাবের এক পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন শেষে ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাড়িতে মারা গেলেন নানা পাটেকর। তারকা হওয়ার দৌড়ে না থেকেও অভিনয়ের শক্তিতে যে একজন শিল্পী দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেন, নানা পাটেকরের ক্যারিয়ার তারই অন্যতম উদাহরণ।