‘জানোয়ার’, ‘ফ্রাইডে’, ‘আমলনামা’, ‘সুড়ঙ্গ’ ও ‘অমীমাংসিত’, বাস্তব ঘটনা ও সমাজের অন্ধকার দিক পর্দায় তুলে ধরতেই আগ্রহী নির্মাতা রায়হান রাফী। এবার তিনি দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি ইউটিউব চ্যানেল ‘কথা হোক অহেতুক’-এর একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার, সিনেমা ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
রায়হান রাফীর শৈশব কেটেছে মাদ্রাসার পরিবেশে, যেখানে সিনেমা দেখা বা বানানোর সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তবে ছোটবেলায় জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ ও মণি রত্নমের ‘রোজা’ দেখে তাঁর মনে পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে একসময় তিনি ভেবেছিলেন চলচ্চিত্র তাঁর জন্য নয়, কিন্তু তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ সেই ধারণা বদলে দেয়। এই সিনেমা তাঁকে বিশ্বাস করায় যে মাদ্রাসায় পড়েও বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব।
তারেক মাসুদকে একবার দেখার আশায় রাফী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে একটি পুরোনো পোস্টারের সামনে তিন দিন অপেক্ষা করেছিলেন। পরে তাঁর সঙ্গে দেখা হলেও অকালমৃত্যুর কারণে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়নি। প্রিয় নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাফী তাঁর প্রথম শর্ট ফিল্ম ‘বেওয়ারিশ’ তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করেন।
পরিচালক হওয়ার পথে রাফীকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ। বড় বড় পরিচালকদের সহকারী হওয়ার চেষ্টা করেও তিনি বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। একবার একটি কাজের আশায় সারাদিন ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে দেখা হলেও কাজ পাননি। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনবোধ তৈরি করেছে এবং গল্প বলার শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সহকারী হওয়ার সুযোগ না পেয়ে রাফী নিজেই শর্ট ফিল্ম বানানো শুরু করেন। বিয়ের ভিডিও করার ক্যামেরা ভাড়া করে, বন্ধুদের অভিনেতা বানিয়ে তাঁর কাজের শুরু। নিজের বাসার ড্রয়িংরুম ও বোনের ঘরে গোপনে শুট করা শর্ট ফিল্ম ‘আজব বাক্স’ ফেসবুকে ভাইরাল হলে তিনি পরিচিতি পান। পরে ‘দ্য স্টোরি অব রতন’ দেখে জাজ মাল্টিমিডিয়ার আব্দুল আজিজ তাঁকে সিনেমা নির্মাণের প্রস্তাব দেন।
বাস্তবতা ও থ্রিলারধর্মী গল্পই রাফীর সিনেমার মূল শক্তি। তাঁর মতে, যে গল্প তাঁকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়, সেটাই তিনি পর্দায় তুলে ধরতে চান। ‘পরাণ’ তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট, যা মাত্র ৫০ লাখ টাকা বাজেটে নির্মিত হয়ে ১২ থেকে ১৪ কোটি টাকার ব্যবসা করে। এই সিনেমার শুটিংয়ের সাত দিনের ফুটেজ হারিয়ে গিয়ে আট মাস পর ফিরে পাওয়ার ঘটনাও তাঁর ক্যারিয়ারের এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।
‘দামাল’কে রাফী তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সিনেমা হিসেবে দেখেন। বাস্তব ফুটবল ম্যাচের আবহ তৈরি করতে তিনি একসঙ্গে ছয়টি ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন। অন্যদিকে ‘সুড়ঙ্গ’ তাঁর পছন্দের ঘরানার সিনেমা হলেও এতে আইটেম গানের প্রয়োজন ছিল না বলে তিনি মনে করেন। ‘তুফান’ ও ‘তাণ্ডব’ সিনেমায় তিনি কারিগরি দিক থেকে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন, যেখানে ছিল ওয়ান-টেক অ্যাকশন দৃশ্য ও হ্যান্ড-টু-হ্যান্ড ফাইট।
পডকাস্টে বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সিনেমা বানানোর ইচ্ছার কথাও জানান রাফী। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত ওই বিদ্রোহে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। রাফীর ভাষায়, একের পর এক লাশ বের হওয়া, গণকবর এবং যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতির পেছনের অজানা গল্প জানার আগ্রহ থেকেই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে চান।
সমাজে যেন একই ধরনের অপরাধ বারবার না ঘটে, সেই ভাবনা থেকেই সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিনেমা বানান বলে জানান রাফী। ‘জানোয়ার’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ জন্মগতভাবে অপরাধী নয়, বরং পরিস্থিতিই মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। তাই এমন কনটেন্ট বানাতে চেয়েছেন, যা দেখার পর কেউ যেন সহিংস অপরাধ কল্পনাও না করে।
বর্তমানে রায়হান রাফী ব্যস্ত নিজ প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমা ‘প্রেশার কুকার’ নিয়ে। পাশাপাশি বড় বাজেটের হরর সিনেমা ‘আন্ধার’-এর কাজও চলছে, যেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ ভিএফএক্স ব্যবহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভিন্নধর্মী ও বাস্তবঘেঁষা গল্প নিয়ে আরও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।
নতুন নির্মাতাদের উদ্দেশে রাফীর পরামর্শ, বড় বাজেট বা বড় প্রযোজকের অপেক্ষা না করে শর্ট ফিল্ম দিয়েই যাত্রা শুরু করা উচিত। তাঁর মতে, এখন স্মার্টফোন দিয়েও মানসম্মত সিনেমা বানানো সম্ভব। প্রতিভা থাকলে তা একদিন সামনে আসবেই, আর সিনেমা বানানোর সময় অতিরিক্ত হিসাব না করে মনের ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।