তিন বছর পর বড় পর্দায় ফিরেই সাফল্যের নতুন অধ্যায় লিখেছেন সামান্থা রুথ প্রভু। ‘মা ইনতি বঙ্গারাম’ শুধু ১০০ কোটি রুপি আয়ের সিনেমা নয়, এই ছবির মাধ্যমে অ্যাকশন তারকা হিসেবেও নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অভিনেত্রী। অথচ এই প্রত্যাবর্তনের আগের কয়েকটি বছর ছিল তার জীবনের অন্যতম কঠিন সময়।
অসুস্থতা, কাজ থেকে বিরতি এবং নিজের পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবার মধ্য দিয়ে বদলে গেছে সামান্থার জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের পরিবর্তিত জীবন, সিনেমার সাফল্য, পরিচালক ও স্বামী রাজ নিদিমোরুর সঙ্গে কাজ, অসুস্থতার অভিজ্ঞতা এবং নারীদের নিয়ে নিজের ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
পর্দার স্বর্ণা ও বাস্তবের সামান্থা
‘মা ইনতি বঙ্গারাম’-এ সামান্থার চরিত্রের নাম স্বর্ণা। শুরুতে তাকে দেখা যায় শাড়ি পরা, চুড়ি হাতে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে থাকা এক সাধারণ নারী হিসেবে। পরে পরিবারের জন্য সেই চুড়ি খুলে রেখে যুদ্ধে নামতে দেখা যায় তাকে।
এই রূপান্তরের সঙ্গে নিজের জীবনেরও মিল খুঁজে পান সামান্থা। সিনেমাটির গল্প লিখেছেন রাজ নিদিমোরু। সাই পল্লবী চরিত্রটি করতে না পারায় রাজ সামান্থাকে প্রস্তাব দেন এবং পরে তাকে মাথায় রেখেই চিত্রনাট্যের বড় অংশ নতুন করে লেখেন।
সামান্থার মতে, স্বর্ণার গল্প তার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। বাস্তবে তাকে কখনো খলনায়কদের সঙ্গে লড়তে হয়নি, তবে বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর যে শক্তি অনেক নারীর মধ্যে রয়েছে, স্বর্ণার চরিত্রে তারই এক অতিরঞ্জিত রূপ দেখেছেন তিনি।
রাজের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নিজের কোনো দ্বিধাও কাজ করেনি বলে জানান সামান্থা। তার প্রতি রাজের পূর্ণ আস্থা এবং তাকে বোঝার ক্ষমতার কারণেই ক্যামেরার সামনে আরও স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পেরেছেন তিনি। এই আস্থার কারণে সিনেমাটির বেশ কিছু দৃশ্য এক টেকেই ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান অভিনেত্রী।
একসময় অভিনয় ছাড়তে চেয়েছিলেন
প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে একসময় অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন সামান্থা। এক বছর বিরতির পর তার মনে হয়েছিল, জীবনে অন্য কিছু করা দরকার। ২০২২ সালে মায়োসাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শেও তাকে বিশ্রামে থাকতে বলা হয়।
সেই সময় বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেন তিনি। একাধিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে ‘সিরিয়াল উদ্যোক্তা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন সামান্থা। একটা সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অভিনয়ের বদলে প্রযোজনায় মন দেবেন এবং পর্দার আড়াল থেকেই নিজের পছন্দের সিনেমা তৈরি করবেন।
তবে রাজ নিদিমোরুর বিশ্বাস ও সাহস শেষ পর্যন্ত তাকে আবার ক্যামেরার সামনে ফিরিয়ে আনে। এর আগে ‘সিটাডেল’-এর সময়ও কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন সামান্থা। এমনকি সে সময় কাজ ছাড়ার ই-মেইলও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু নির্মাতারা তাকে কাজ থেকে সরে যেতে দেননি।
মাত্র ৫৪ দিনে তৈরি সিনেমা
‘মা ইনতি বঙ্গারাম’ তৈরির সময় নির্মাতারা বাজেট ও সময় দুটোই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। প্রায় তিন বছর পর সামান্থার সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় ছবিটির সাফল্য নিয়ে নির্মাতাদের মধ্যেও কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল।
মাত্র ৫৪ দিনে সিনেমাটির শুটিং শেষ করা হয়। বাসের অ্যাকশন দৃশ্য, ক্লাইম্যাক্সসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য এক দিনেই ধারণ করা হয়েছে। সামান্থার মতে, ইউনিটের সবাই নিজেদের সামর্থ্যের সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন।
মুক্তির পর অবশ্য প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায় ছবিটির সাফল্য। বিশেষ করে বিভিন্ন বয়সী নারী ও পরিবারের সদস্যদের প্রেক্ষাগৃহে উৎসবের পোশাকে সিনেমাটি দেখতে আসার দৃশ্য সামান্থাকে আবেগাপ্লুত করেছে।
তার মতে, এই সাফল্য এক রাতের ঘটনা নয়। মুক্তির আগের দুই বছর ধরে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা, নিজের সিদ্ধান্ত ও জীবন নিয়ে ভাবার প্রক্রিয়াটিও এই সাফল্যের অংশ।
অসুস্থতা বদলে দিয়েছে সামান্থাকে
অসুস্থ হওয়ার আগে কাজ, লক্ষ্য, ফলাফল ও সাফল্যের সঙ্গে নিজের পরিচয়কে মিলিয়ে দেখতেন সামান্থা। কিন্তু অসুস্থতার কারণে যখন তাকে থেমে যেতে হয়, তখন নিজের কাছেই প্রশ্ন করেন, ‘আমি যখন কিছুই করছি না, তখন আমি কে?’
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উপলব্ধি করেন, একজন মানুষের মূল্য শুধু তার কাজ বা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না। নিজের সময়, মানসিক শান্তি ও স্বাস্থ্যেরও আলাদা মূল্য রয়েছে। সে কারণেই এখন অনেক বেশি বেছে কাজ করেন তিনি।
ফিরে আসার পর অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ব্র্যান্ডের কাজ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলেও জানান সামান্থা। বাইরে থেকে তার জীবনকে হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু তার কাছে এটি এখন অনেক বেশি অর্থপূর্ণ।
অসুস্থতা তাকে আত্মবিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞাও দিয়েছে। আগে নিজের উপস্থিতি, শরীরচর্চা ও রুটিনের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতেন। পরে বুঝেছেন, সবকিছু সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এখন স্থিরতা, বিশ্বাস, আশা এবং প্রতিকূলতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজের সঙ্গে সম্পর্ক
পেশাগত ও ব্যক্তিগত দুই ক্ষেত্রেই রাজ নিদিমোরু এখন সামান্থার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। সিনেমা নিয়ে তাদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়। রাজের বিচারবুদ্ধির ওপরও তার গভীর আস্থা রয়েছে।
সামান্থার মতে, রাজ সহজ মানুষ এবং সব সময় অন্যের ভালো চান। মতবিরোধ হলেও তারা একে অপরের কথা শোনেন। রাজ তাকে আরও ভালো অভিনেতা হতে সাহায্য করেছেন বলেও জানান তিনি।
এবার মা হওয়ার পালা
জীবনের নতুন অধ্যায় নিয়েও উচ্ছ্বসিত সামান্থা। একসময় তিনি ও রাজ দুজনেই মেনে নিয়েছিলেন, সন্তান হয়তো হবে, আবার নাও হতে পারে। যেকোনো ফলাফলের জন্যই তারা প্রস্তুত ছিলেন।
তাই অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর তাদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত আনন্দ। ‘মা ইনতি বঙ্গারাম’-এর একটি গানের শুটিংয়ের সময় বিষয়টি জানতে পারেন সামান্থা। এখন জীবনের এই পরিবর্তনের জন্য তিনি প্রস্তুত এবং নতুন অধ্যায় নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত।
নারীদের নিয়ে সামান্থার ভাবনা
নারীদের নিজেদের ছোট করে রাখার মানসিকতা নিয়েও কথা বলেছেন সামান্থা। তার মতে, অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি হবে বা কেউ কী ভাববে, সেই চিন্তায় অনেক নারী নিজেদের অর্জনের কৃতিত্বও পুরোপুরি নেন না। তিনি মনে করেন, সেই সময় এখন শেষ হওয়া উচিত।
সামান্থা এমন একটি সময় দেখতে চান, যখন কোনো সিনেমাকে শুধু ‘নারীপ্রধান’ বলে আলাদা করে চিহ্নিত করার প্রয়োজন হবে না। নারী চরিত্রও পুরুষ চরিত্রের মতো জটিল, বৈপরীত্যপূর্ণ ও বাস্তব হবে। কোনো নারী শুধু নায়কের স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা তাকে সাহস দেওয়ার চরিত্র হয়ে থাকবে না; বরং নিজের গল্পের কেন্দ্রীয় মানুষ হবে।
নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক কর্মপরিবেশ তৈরির পক্ষেও কথা বলেছেন তিনি। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেও নারী প্রতিনিধিত্ব, নতুন প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়া এবং বিভিন্ন কণ্ঠকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন সামান্থা।
তার বিশ্বাস, নারীদের অন্য কারও বেছে নেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। একজন নারী এক পা এগিয়ে গেলে তার পথ অনুসরণ করে অন্যরাও এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেতে পারেন।
মাতৃত্বের কারণে দীর্ঘ বিরতিতে যেতে চান না সামান্থা। তবে এবার নিজের শরীর ও পরিস্থিতির কথা শুনেই কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও ব্যবসায়ও সময় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।