বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পীদের পেশাগত চরম সংকট, পারিশ্রমিক বৈষম্য ও তথাকথিত ‘চরিত্রাভিনেতাদের’ অবমূল্যায়ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও বিস্ফোরক পোস্ট দিয়েছেন জনপ্রিয় প্রবীণ অভিনেত্রী নাজনীন হাসান চুমকি। দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবনের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা ও ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে তিনি তুলে ধরেছেন এক নির্মম বাস্তবতা।
নিজের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে চুমকি লিখেছেন, ‘কাজ থাকলে কাজ করি, কাজ না থাকলে ঘরের কাজকর্ম বা আলস্যে দিন কাটাই। কোনো সমস্যা নাই। কোনোদিন নায়িকা হতে চাইনি। চরিত্রাভিনেতা হতে চেয়েছি। তাই এখন মিডিয়াতে অবস্থান “প্রয়োজনীয়তা” সেটাতেও কোনো সমস্যা নেই।’
তবে শুরুতে নিজের ক্ষেত্রে ‘কোনো সমস্যা নেই’ বলে আশ্বস্ত করলেও, লেখার গভীরে গিয়ে দেশের নাট্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের মূল কাঠামোগত সংকটের দিকে আঙুল তুলেছেন এই জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী। বাংলাদেশে একঝাঁক তুমুল দক্ষ চরিত্রাভিনয় শিল্পী থাকলেও প্রায়শই শোনা যায়, জ্যেষ্ঠ ও গুণী শিল্পীদের একটা বড় অংশ এখন নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না। অনেকেরই পর্দায় উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নাজনীন হাসানের মতে, দেশে নামমাত্র কাস্টিং ডিরেক্টর থাকলেও কোনো কার্যকর বা পেশাদার কাস্টিং এজেন্সির মারাত্মক অভাব রয়েছে। ফলে বর্তমান যুগের নাটক কিংবা সিনেমার গল্প ও পুরো অর্থায়ন সম্পূর্ণভাবে কতিপয় ‘নায়ক-নায়িকা’ বা সিন্ডিকেট কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যার দরুন গুণী চরিত্রাভিনেতাদের জন্য টিকে থাকাটা এখন এক পর্বতসমান চ্যালেঞ্জ।
এই সংকটের কথা স্পষ্ট করে চুমকি লিখেছেন, ‘সমস্যা হলো, বাংলাদেশে কাস্টিং ডিরেক্টর রয়েছে। কিন্তু কাস্টিং এজেন্সি নেই। এখানে গল্প দাঁড়িয়েছে, নায়ক-নায়িকানির্ভর। ফলে, চরিত্রাভিনেতাদের কাজ দাঁড়িয়েছে চ্যালেঞ্জ পর্যায়ে। মূল্যায়ন কোনো কোনো ডিরেক্টর করলেও অধিকাংশের কাছে দিনশেষে ওই যে প্রয়োজনীয়তা।’
শুধু তাই নয়, বর্তমান অভিনয় অঙ্গনের এই ধারা নতুন ও পুরনো অনেক জাত শিল্পীর জন্যই এক ভীতি ও শঙ্কার বার্তা দিচ্ছে। কারণ, এখানে দিন দিন গুণী চরিত্রাভিনেতারা প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চুমকির মতে, বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির যা অবস্থা, তাতে অনেকের পক্ষেই সমাজে বুক ফুলিয়ে বলার মতো অবস্থা নেই যে তিনি একজন গর্বিত অভিনয়শিল্পী। তাহলে এই দেশে আসলে কারা নিজেদের অভিনয়কে একমাত্র পেশা হিসেবে দাবি করতে পারেন? এর উত্তরও নিজের পোস্টে সপাটে দিয়েছেন তিনি। চুমকি লিখেছেন, ‘মূলত বাংলাদেশে অভিনয়কে পেশা বলতে পারে নায়ক-নায়িকা বা সুপারস্টাররা। আর বাকিরা এই চোরাবালিতে না ডোবার জন্যে দমবন্ধ এক জীবন যাপন করার চেষ্টা করছে। না হয়, এসে ফেঁসে গেছে।’
অভিনেত্রীর ভাষ্য, হাতেগোনা কয়েকজন তরুণ ও মননশীল নির্মাতা চরিত্রাভিনেতাদের যথাযথ স্ক্রিনটাইম ও সম্মান দিলেও, ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশের কাছেই তারা কেবল স্ক্রিনের ‘প্রয়োজন মেটানোর সস্তা উপাদান’। এ কারণে অনেক শক্তিশালী ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী এক চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন।
পোস্টের শেষ অংশে এসে নাজনীন হাসান চুমকি নিজের ব্যক্তিগত অভিমান ও আক্ষেপকে ছাড়িয়ে পুরো শোবিজ শিল্পের এক গভীর অন্ধকারের কথা তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপের সুরে লিখেছেন, ‘অনেক শিল্পী এই পেশার চোরাবালি থেকে বাঁচতে দমবন্ধ জীবন যাপন করছেন, আবার অনেকে হতাশার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন।’
তাই লেখার শুরুতে নিজেকে শান্ত রাখলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি সমস্যা আসলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান এবং সেটি শুধু তাঁর একার নয়, বরং এ দেশের সামগ্রিক মিডিয়ার অসংখ্য পেশাজীবী শিল্পীরও। তীব্র অভিমানে এই অভিনেত্রী আরও যোগ করেন, ‘শিল্পমন ধৈর্যের যুদ্ধে ক্রমাগত হতাশার কালো থাবায় নিষ্পেষিত হচ্ছে। তাই এখন আর লিখতে পারছি না কোনো সমস্যা নেই। কারণ, শুরুটা নিজের কথা দিয়ে শুরু করলেও শেষটা মিডিয়ার পেশাজীবী সকলকে নিয়ে, তাই সমস্যা আছে।’