পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর একসময় তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছিল এবং তিনি ফিরেছিলেন স্বাভাবিক জীবনেও। তবে সেই স্বস্তির সময়ের পর নতুন করে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন তিনি। তিন মাস আগে তাঁর শরীরে দ্বিতীয়বারের মতো ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শনাক্ত হয়। এবার ধরা পড়েছে ওভারিয়ান ক্যানসার। দ্রুত অস্ত্রোপচারের পর পরীক্ষায় এটি ‘হাই-গ্রেড কার্সিনোমা’ হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় বর্তমানে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন তিনি।
রোববার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে নতুন করে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা জানিয়েছেন সামিয়া। তিনি লিখেছেন, তিন মাস আগে তাঁর শরীরে দ্বিতীয় ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়ে। এরপর দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হয়। টিউমারটি হাই-গ্রেড কার্সিনোমা হওয়ায় এখন তাঁকে কেমোথেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
এবারই প্রথম কেমোথেরাপি নিচ্ছেন সামিয়া। ২০২২ সালে প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ার পর তাঁর চিকিৎসা হয়েছিল ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে। তাই এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে একেবারেই ভিন্ন। গত পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করলেও এবার নতুন ধরনের চিকিৎসা ও শারীরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে।
চুল পড়ার আগেই নতুন লুক
কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যেতে পারে বলে চিকিৎসকদের কাছ থেকে আগেই জানতে পেরেছেন সামিয়া। তবে বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে বরং নিজের মতো করে পরিস্থিতিকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সেই ভাবনা থেকেই চুল ছোট করে নিয়েছেন এই উপস্থাপক।
নতুন হেয়ারকাটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে সামিয়া জানিয়েছেন, চুল পড়ে যাওয়ার আগেই নতুন লুকটি উদ্যাপন করতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই। সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারের চিকিৎসার কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন সামিয়া। যাঁরা এই পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাঁরাই এই লড়াইয়ের কষ্ট সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি। নিজের কাছের মানুষদের যেন কখনো এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও জানিয়েছেন সামিয়া।
সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আল্লাহ যেন তাঁর জন্য সবকিছু সহজ করে দেন এবং আগেরবারের মতো এবারও মানসিক শক্তি ধরে রেখে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
২০২২ সালে শুরু হয়েছিল লড়াই
সামিয়া আফরিনের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু হয় ২০২২ সালে। ওই বছরের এপ্রিলে শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করান তিনি। তখন তাঁর শরীরে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার ধরা পড়ে। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত সিঙ্গাপুরে যান সামিয়া।
আগের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, শুরুতে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন বলে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো পরীক্ষায় কোনো ভুল হয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে বিস্তারিত পরীক্ষার পর জানা যায়, তিনি কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত এবং সেটি চতুর্থ ধাপে পৌঁছে গেছে। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুস ও লিম্ফ নোডেও।
এই খবর তাঁর জন্য বড় ধাক্কা ছিল। একপর্যায়ে চিকিৎসার কিছু পদ্ধতি নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে না পেরে চিকিৎসা না নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। পরে সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। ২১ দিন পরপর দেওয়া সেই ব্যয়বহুল চিকিৎসাপদ্ধতির ওপরই শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখেন সামিয়া।
ইমিউনোথেরাপির প্রথম কয়েক মাস বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়েছিল তাঁকে। চিকিৎসার পর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়তেন যে কখনো ১০ কদম হাঁটার শক্তিও থাকত না। শরীর কাঁপা ও ত্বকে বিভিন্ন সমস্যার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছিল। তারপরও অসুস্থতাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাননি তিনি।
চিকিৎসার পাশাপাশি অফিস করেছেন, কাজ করেছেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। এমনকি চিকিৎসার ডোজ নেওয়ার পর বাসায় ফিরে অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অসুস্থতার কারণে নিজের স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দিতে চাননি সামিয়া।
দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবরও নিজের মধ্যে রেখেছিলেন তিনি। পরিবার ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু ছাড়া বিষয়টি খুব বেশি মানুষকে জানাননি। অসুস্থতার কারণে মানুষের সহানুভূতি নিতে চাননি বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই উপস্থাপক।
দুই বছরের চিকিৎসা শেষে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়। এরপর দীর্ঘ সময় কোনো চিকিৎসা নিতে হয়নি। চিকিৎসকেরাও আশাবাদী ছিলেন যে ক্যানসার আর ছড়িয়ে পড়ছে না। সামিয়াও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ও কাজকর্মে ফিরেছিলেন।
তবে সেই স্বস্তির পর আবারও নতুন লড়াই শুরু হয়েছে তাঁর। এবার ইমিউনোথেরাপির পরিবর্তে কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে সামিয়াকে। কঠিন এই সময়েও পাঁচ বছর আগের মতো মানসিক শক্তি ধরে রাখতে চান তিনি। চুল পড়ে যাওয়ার আগেই নতুন লুক বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে যেন সেই বার্তাই দিয়েছেন, পরিস্থিতি বদলালেও জীবনকে নিজের মতো করে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি।