ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের বিকিনি কভার ফটোশুটে শর্মিলা ঠাকুরের উপস্থিতি। প্রকাশের পর ছবিটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা, বিতর্ক এবং নানা গুঞ্জনের জন্ম হয়েছিল। কয়েক দশক পর সেই ঘটনা নিয়ে মুখ খুলে বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী জানালেন, বহুল আলোচিত সেই ফটোশুটের ধারণাটি আসলে তার নিজেরই ছিল।

সম্প্রতি ‘উই দ্য উইমেন’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্তের স্মৃতিচারণ করেন শর্মিলা ঠাকুর। তিনি বলেন, এত বছর ধরে অনেকে মনে করে এসেছেন যে ওই ফটোশুটটি ছিল প্রচারণা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি মোটেও তেমন ছিল না।

শর্মিলার ভাষায়, “আসলে আইডিয়াটা আমারই ছিল। ফটোগ্রাফার ধীরাজ চাওলা একটি ফটোশুট করতে চেয়েছিলেন। তখন আমিই বলেছিলাম, বিকিনি পরে ছবি তুললে কেমন হয়? পুরো সিদ্ধান্তটাই আমার ছিল। এর দায় অন্য কারও ওপর চাপাতে পারি না। তখন আমার শুধু মনে হয়েছিল, ছবিগুলো দেখতে ভালো লাগবে।”

তবে ছবিটি প্রকাশের পর যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না এই অভিনেত্রী। তার ভাষায়, পুরো ঘটনাটি যেন ছিল একটি ‘বিকিনি বোমা’। চারদিকে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা, আর অনেকেই ধরে নেন এটি ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জনের কৌশল।

এ প্রসঙ্গে শর্মিলা বলেন, “অনেকে ভেবেছিলেন, মানুষের নজর কাড়তে এবং প্রচারণা পেতেই আমি পরিকল্পিতভাবে এটি করেছি। কিন্তু সত্যি বলতে, এমন কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।”

বিতর্কের প্রভাব তার পেশাগত জীবনেও পড়েছিল। শর্মিলা জানান, ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং সেই অবস্থায় নির্মাতা শক্তি সামন্তের কাছে যান। পরিচালক তাকে দীর্ঘ সময় ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, একজন অভিনেত্রীকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকতে হলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি খুব মন খারাপ করে শক্তি সামন্তের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনেকক্ষণ বুঝিয়েছিলেন, একজন অভিনেত্রীকে যদি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়, তাহলে কীভাবে আচরণ করা উচিত। আমি তার সব কথা মন দিয়ে শুনেছিলাম, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসিনি।”

সময়ের সঙ্গে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলে জানালেও সেই ফটোশুট নিয়ে আজও কোনো অনুশোচনা নেই শর্মিলা ঠাকুরের। বরং তিনি মনে করেন, মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত এবং ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়।

তার ভাষায়, “মানুষ নিজের ভুল থেকে শেখে। কিন্তু এটা করার জন্য আমার কোনো আফসোস নেই।”

বিতর্কের সেই কঠিন সময়ে তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন স্বামী, ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার মনসুর আলী খান পতৌদি। তখন পতৌদি লন্ডনে ছিলেন। পুরো ঘটনা জানিয়ে শর্মিলা তাকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সংক্ষিপ্ত কিন্তু আন্তরিক উত্তরটি আজও তার স্মৃতিতে অমলিন।

শর্মিলা বলেন, “তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমাকে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ এই কয়েকটি শব্দই আমার জন্য অনেক বড় সমর্থন ছিল। তিনি সব সময় আমার পাশে ছিলেন। এখন এত বছর পর সেই কভারের দিকে তাকালে আমার কোনো অস্বস্তি হয় না। বরং আমি বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ স্বস্তিতে আছি।”

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ফিল্মফেয়ারের সেই বিকিনি কভার আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এতদিন পর শর্মিলা ঠাকুরের এই স্বীকারোক্তি সেই আলোচিত ঘটনার পেছনের বাস্তব গল্পটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।